আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হিমালয়কন্যা নেপালের রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের প্রচণ্ড হাওয়া। দীর্ঘ ছয় দশকের প্রথাগত রাজনীতির বলয় ভেঙে এক অভাবনীয় ইতিহাস গড়লো তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি বালেন্দ্র শাহ এবং তার দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)। গত ৫ মার্চের সাধারণ নির্বাচনে ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টিতে জয়লাভ করে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে মাত্র তিন বছরের পুরনো এই দলটি। আধুনিক নেপালের ইতিহাসে এটিই কোনো দলের বৃহত্তম জয়। সাবেক র‌্যাপার ও অবকাঠামো প্রকৌশলী বালেন্দ্র শাহ এখন নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

বিপ্লব থেকে ব্যালট: জেন-জি প্রজন্মের উত্থান

এই জয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে নেপালের ‘জেন-জি’ বা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমে এসেছিল। সেই বিক্ষোভে ৭৭ জন প্রাণ দিলেও পিছু হটেনি তরুণরা; তাদের আন্দোলনের মুখে পতন ঘটেছিল তৎকালীন সরকারের। সেই বিক্ষোভের চেতনাকে পুঁজি করে ‘ঘণ্টি’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নামে আরএসপি। ৫ মার্চের ভোটে নেপালের তরুণরা বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আর পুরনো ঘুণেধরা নেতৃত্বের ওপর ভরসা রাখতে রাজি নয়।

পুরনো শক্তির শোচনীয় পরাজয়

বালেন্দ্র শাহ’র এই জয়ে নেপালের রাজনীতির দুই স্তম্ভÑ নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। যেখানে বালেনের দল ১৮২টি আসন পেয়েছে, সেখানে নেপালের প্রাচীনতম দল নেপালি কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৩৮টি আসন। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির দল (সিপিএন-ইউএমএল) মাত্র ২৫টি আসনে জয়ী হয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন শাহ তার জনপ্রিয়তায় গগন থাপা ও কেপি ওলির মতো হেভিওয়েট নেতাদেরও ম্লান করে দিয়েছেন।

বালেন্দ্র শাহ: র‌্যাপার থেকে রাষ্ট্রনায়ক

৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ নেপালে ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এই তরুণ নেপালের হিপ-হপ বা ‘নেফপ’ অঙ্গনের একজন জনপ্রিয় তারকা। তার জনপ্রিয় সামাজিক বার্তাধর্মী গান ‘বালিদান’ (উৎসর্গ) ইউটিউবে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছে। গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় তিনি তরুণদের হৃদয়ে স্থান করে নেন। জেন-জি প্রজন্মের কাছে তিনি এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক মূর্ত প্রতীক।

আগামীর অঙ্গীকার: ৪২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন

বালেন্দ্র শাহ ও তার দল আরএসপি কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এসেছে। তাদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো হলো:

দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন যুদ্ধ-রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি-তরুণদের বিদেশে পাড়ি দেওয়া রোধ করে দেশে কাজের সুযোগ তৈরি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি-আগামী পাঁচ বছরে নেপালের ৪২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করা।

বিশেষজ্ঞের অভিমত

নেপালের সংবিধান বিশেষজ্ঞ পূর্ণ মান শাক্য বলেন, "সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, আমরা আশা করতে পারি যে এটি নেপালকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল সরকার দিতে পারবে।" তরুণ সংসদ সদস্য শিশির খানাল এই বিজয়কে ‘দায়িত্বশীলতার ম্যান্ডেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

নেপালের এই জেন-জি বিপ্লব দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। তরুণরা যখন একতাবদ্ধ হয়, তখন দীর্ঘদিনের পুরনো ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিও যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, বালেন্দ্র শাহ’র বিজয় তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। নেপালের আকাশ এখন নতুন ভোরের প্রত্যাশায় রাঙানো।