• পরিস্থিতি সামাল দিতে তাবু টানিয়ে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল বানাচ্ছে সরকার
  • শিশু মৃত্যুতে হাসপাতালে প্রতিদিন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা
  • রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি

দেশে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্তণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে শিশু মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা। কয়েক বছর ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম পরিস্থিতি হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ আর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে বলে আশ্বস্ত করা হলেও হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরিবর্তে অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি অস্থায়ী তাবু টানিয়ে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে হাম রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে সরকার। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজের অডিটরিয়ামের সামনে তাবু টানিয়ে অস্থায়ী হাসপাতাল বানাতে দেখা গেছে।

জানা গেছে, হাম সংক্রমণ দেশজুড়ে ছড়িয়ে যাওয়ায় বিদ্যমান সরকারি হাসপাতালগুলো দিয়ে রোগী ব্যবস্থাপনা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভিড় করায় ডাক্তার নার্সরা তা সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। চিকিৎসা না পেয়ে শিশু মৃত্যুতে প্রতিদিন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটছে হাসপাতালগুলোতে। উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা না পেয়ে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছে মানুষ।

বিশেষ করে গত কয়েক দিনে কাক্সিক্ষত চিকিৎসা সেবা না পেয়ে ঢাকার বাইরে থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছে। পরিস্থিতি আঁচ করে সরকার সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি হাসপাতালের বাইরে তাবু টানিয়ে হাম রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজে সরেজমিনে দেখা যায় অডিটরিয়ামের পেছনে তাবু টানিয়ে বেড স্থাপন করার কাজ শেষ করা হয়েছে। যেকোন সময় সেখানে রোগী স্থানান্তর করা যাবে বলে জানিয়েছেন কর্মরত কর্মচারীরা।

আলাপকালে শামছুল ইসলাম নামের একজন কর্মচারী দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জানান, হাম উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের জন্য চালু হচ্ছে ২০টি শয্যা। হামের পর ডেঙ্গু রোগীদের জন্যেও এটি ব্যবহৃত হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই ফিল্ড হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলের পক্ষ থেকে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় এমনকি সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হবে এখানে।

দেখা গেছে, চারপাশে তাঁবু টাঙিয়ে দিয়েছে, যাতে ঝড় বৃষ্টিতে কোনো অসুবিধা না হয়। ভেতরে ২০টি বেড দেওয়া আছে। এছাড়া ৯টি এসির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগ থেকে চারপাশে ড্রেন নির্মাণে কাজ চলছে, যাতে পানি না জমে। যেকোন সময়এটি চালু করা হবে।

হামে প্রাণহানি বৃদ্ধিতে বাড়ছে উদ্বেগ :

এদিকে প্রতিদিন শিুশু মৃত্যুতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে। সরকারের আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছে না রোগী পরিবার। গতকাল বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকা রাব্বি নামের এক শিশু রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণে। কিস্তু আমরা দেখছি প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে। মায়ের কোল খালি হচ্ছে। আমরা সরকারের কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছি না। চিকিৎসাতো আমাদের অধিকার। সরকার হেলথ কার্ড দিচ্ছে। কিন্তু মানুষ তো তার মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। আমরা আমাদের সন্তান বাচাতে কোথায় যাবো কুল কিনারা পাচ্ছি না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানো এবং টিকাদানের ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং এর ফলে নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব ও মৃত্যুর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ টিম কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও টিকা কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, টিকা দেওয়ার হারে ঘাটতির কারণে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৮৪% শিশু হামের প্রথম ডোজ পেয়েছে, যা একটি উদ্বেগের কারণ।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশু ও নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এমন শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৪৪৫ জন।

গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হামে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে গত দেড় মাসে সারা দেশে ৩১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ শিশুর। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৬৩ জন।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান। তিনি গতকাল কুর্মিটোলা হাসপাতালে এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা খুব নাজুক উল্লেখ করে বলেন, আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বঞ্চিত ও অসমভাবে বণ্টিত। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে এক লড়াই।

একই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার, তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, তবে ধাপে ধাপে এ খাতে উন্নয়ন আনা হচ্ছে। মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি দায়বদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭২৬ জনে। একই সময়ে সন্দেহজনক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪২ হাজার ৯৭৯ জন। শুধু আক্রান্তই নয়, মৃত্যুর সংখ্যাও ক্রমেই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত হামে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৫৪ জনে পৌঁছেছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ২৬৩ জন। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।