ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আয়োজনে ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন : বিতর্ক ও পর্যালোচনা শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, ইসলামী স্কলার, শিক্ষাবিদ ও নারীনেত্রীরা বিতর্কিত নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী, সংবিধান পরিপন্থি, বৈষম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান ও নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা। এ কমিশন গত ১৯ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ৩১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি ১৭টি অধ্যায়ে ৪৩৩টি সুপারিশ করা হয়েছে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে প্রকৃত নারী উন্নয়ন সাধিত হয়নি বরং সমাজে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। এ রিপোর্ট শুধুমাত্র ধর্মবিরোধী নয়, এটি অগণতান্ত্রিক, সংবিধানবিরোধী এবং সামাজিক মূল্যবোধ পরিপন্থি। মুসলিমদের বিয়ে, তালাক, অভিভাবকত্ব, সম্পদ বণ্টন সম্পর্কে ইসলামে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু এ কমিশন গুটিকয়েক মানুষের ব্যক্তিগত মতবাদ এ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং অবিলম্বে কমিশন বাতিল করতে হবে। ভবিষ্যতে, কোনো কমিশন গঠিত হলে তা যেন এদেশের মানুষের ধর্মীয় আবেগকে গুরুত্ব দেয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। নারী পুরুষের মধ্যে একটা বিভাজন তৈরি করেছে নারী কমিশন। বিতর্কিত নারী কমিশন বাতিলের দাবি জানায়।

গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আয়োজনে ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন : বিতর্ক ও পর্যালোচনা শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এইসব কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মানারাত ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত ভিসি ও ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রবের সভাপতিত্বে এবং ড. আবদুল মান্নানের উপস্থাপনায় গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি অধ্যাপক ড. ফেরদৌসী আরা খানম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, আইপাস বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাডভাইজর ডা. শামিলা নাহার, অ্যাডভোকেট সাবিকুন নাহার মুন্নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক আরিফুর রহমান অপু, শাহজালার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শামীমা তাসনীম, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহীন আরা আনোয়ারী, বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের মহাসচিব ড. খলিলুর রহমান মাদানী, আয়নাঘরে দীর্ঘদিন নির্যাতিত লে. কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি হাসিনা মমতাজ মারিয়া, মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্সের খতিব মাওলানা আবদুল হাই মো. সাইফুল্লাহ, মানারাত ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুস সামাদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম আবদুল হান্নান, বুয়েটের ন্যানো ম্যাটেরিয়ালস এবং সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফকরুল ইসলাম প্রমুখ।

গোলটেবিল বৈঠকে প্রস্তাবিত নারী কমিশনের প্রস্তাবিত রিপোর্টের বিভিন্ন অসঙ্গতি এবং বিতর্কিত অধ্যায়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে যৌন পেশাকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবির অপচেষ্টাকে সকল ধর্মের বিরোধী বলে অভিহিত করেন বক্তারা। তারা আরও বলেন, কমিশনটি ১০ জন নারীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে ধর্মবিদ্বেষ ও অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকা-ের অভিযোগ রয়েছে। যারা সবাই ধর্মহীনতাকেই প্রমোট করে। যে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, সেই মুসলিমদের বিশ্বাস এবং চিন্তার প্রতিনিধিত্ব তারা করে না। তাদের অনুসৃত কিছু নারীবাদীর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে রিপোর্টটি তৈরি করেছে। যেখানে অধিকাংশ মানুষের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটেনি। সুতরাং রিপোর্টটি বাস্তবতা-বিবর্জিত ও একপেশে। সুতরাং সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ধর্ম ও গণবিরোধী এ প্রতিবেদন বাতিল করতে হবে। ধর্মপ্রাণ বুদ্ধিজীবী সমন্বয়ে কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায় সম্পূর্ণ প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ পেলে দেশে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ গোল টেবিল বৈঠকের বিষয়বস্তুর আলোচনা ও বক্তাদের বক্তব্যের বিষয়সহ নারী কমিশনের বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে সার্বিক মূল্যায়ন করে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, কমিশনের এসব সুপারিশ নিয়ে পালটাপালটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। এসব সুপারিশে আপত্তি জানিয়ে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলের আহবান জানিয়েছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, অভিন্ন পারিবারিক আইনের মাধ্যমে সব ধর্মের নারীকে সমান অধিকার, উত্তরাধিকার আইনে সমান অধিকার এবং শ্রম আইনে যৌনকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা একবারে অযৌক্তিক।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, প্রথম সৃষ্টি নারী একজন নবীর স্ত্রী হিসেবে মর্যাদা পাই। ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মে নারীর অবস্থা দেখে বুঝতে হবে ইসলাম ধর্মেই নারীর বেশি সম্মান দেয়া হয়েছে। সকল পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে অর্ধ-উলঙ্গ করা হয়েছে। পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় স্ত্রীর বক্তব্যের মাধ্যমে। নারী কমিশন ও তার রিপোর্ট বাতিল করতে হবে। এ কমিশনের রিপোর্ট রাষ্ট্র ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সরকারকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নারী কমিশন রিপোর্ট আমাদের ইমান ধ্বংস করার কমিশন। ইসলাম ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংস করার কমিশন। পারিবারিক ঐতিহ্য ধ্বংস করার কমিশন। ন্যায্যতা ও সমতা এক জিনিস নয়, কুরআন ও হাদিস অনুসারে ইসলাম যে অধিকার দিয়েছে তার বাস্তবায়ন করা। সমতা হতে হবে ন্যায্যতা ভিত্তিতে। এই কমিশন সমাজ ও ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, প্রতিবেদনে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান পারিবারিক আইনের সংস্কার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব আইনের পরিবর্তে অভিন্ন পারিবারিক আইনের মাধ্যমে সব ধর্মের নারীর জন্য বিয়ে, তালাক ও সন্তানের ভরণপোষণে সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অধ্যাদেশ জারি করার সুপারিশের পাশাপাশি সব সম্প্রদায়ের জন্য আইনটিকে ঐচ্ছিক রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করে মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করে সম্পদে নারীর ৫০ শতাংশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে কমিশন।

গোল টেবিল বৈঠক শেষে সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, নারী কমিশনের প্রস্তাবিত প্রতিবেদন নারী-পুরুষের অধিকারে হস্তক্ষেপ। পতিতাবৃত্তির কুপ্রভাব নিয়ে বহুমুখী বিশ্লেষণ করে বক্তব্য দেন তিনি। যার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভিপ্রায়ে নারী কমিশন উল্লেখ করেছে। তিনি এই জাতি বিনাশী প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহবান জানান।

ড. ফেরদৌস আরা খানম বলেন, ক্ষমতা শুধু পুরুষের নয় নারীরও আছে। পুরুষকে ভেঙ্গে নয় পুরুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে চাই আমরা নারীরা। নারীর সমতা নয় নারীর ন্যায্য অধিকার এবং কুরআন ও হাদিস অনুসারে ইসলাম যে অধিকার দিয়েছে তার বাস্তবায়ন চাই।

হেলথ সিস্টেম, আইপাস বাংলাদেশের সাবেক সিনিয়র এডভাইজর ডাঃ শামিলা নাহার বলেন, বাল্যবিবাহ করার কথা বলা হয়েছে কিন্তু গার্মেন্টসে ১৬ নিচে কাজ করছেন সেটা নিয়ে কোনো কথা নাই।

অ্যাডভোকেট সাবিকুন নাহার মুন্নি বলেন, ২৪ জুলাই বিপ্লবের পর তারা কিভাবে সমাজ বিরোধী, রাষ্ট্র বিরোধী সংবিধান বিরোধী এমন একটি প্রস্তাব কিভাবে পেশ করার সাহস পেল। তারা সমাজে সংহিতা ও সংঘাত সৃষ্টি করতে চাই।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় লোক প্রশাসন বিভাগ ও সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী প্রফেসর ড শামীমা তাসনীম বলেন, এই রিপোর্ট আমাদেরকে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে যাবে। এটা পাশবিক সমাজ বিনির্মানে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। এই কমিশনের রিপোর্ট বিষয়ে সরকারের বক্তব্য দরকার। নতুন কমিশন গঠন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: শাহীন আরা আনোয়ারী বলেন, এই কমিশন নারীকে পতিতা বানানোর আয়োজন করেছে।

ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এই কমিশন রিপোর্ট পেশ করেন। ইসলাম ও অন্য ধর্মের ধর্মীয় বিধানের বিরুদ্ধে রিপোর্ট তৈরি করেছে নারী কমিশন। পরিবারে সমাজে একটা হানাহানি সৃষ্টি করতে চাই এই কমিশন।।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল অব. হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক বলেন, পরিবারে বিভাজন কমিশন, নারীকে পতিতা বানানো কমিশন, নারীবাদী উশৃংখল কমিশন। আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এ কমিশন।

মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্স খতীব আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ বলেন, অন্যায় কমিশন গঠন করেন নারীকে নিয়ে। যৌন কর্মীদের পুনঃবাসন করতে হবে। ইসলাম নারীদের মর্যাদা রক্ষা করেছে। শরীয়াহ কোর্ট চালু ও বিচার করতে হবে।

সম্মিলিত নারী প্রয়াস সহকারী সেক্রেটারি এবং ভাইস, এভ্যারোজ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক স্কুল ভাইস প্রিন্সিপাল মাহসীনা মামতাজ মারিয়া বলেন, নারীর ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

ন্যানোম্যাটেরিয়ালস এবং সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, ঘরে ঘরে কারখানা বানাতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষা বাড়াতে হবে।