ঢাকার কেরানীগঞ্জে গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে। বাকিদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। গতকাল রোববার ক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম এ তথ্য জানান। অগ্নিকান্ডের পর কারখানাটি থেকে প্রথমে পাঁচজনের ও পরে আরও একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। অন্তত দুই জন দগ্ধ হয়েছেন। এ ঘটনায় কারখানা মালিকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। একজনকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ওসি বলেন, অগ্নি দুর্ঘটনায় আমরা ছয়টি লাশ উদ্ধার করেছি। এর মধ্যে তিনটি শনাক্ত হয়েছে। তাদের অভিভাবকরা আছেন। তাদের জিম্মায় বাকিগুলো হস্তান্তর করা হবে। যেগুলো শনাক্ত হয়নি, সেগুলো স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গের ফ্রিজে রাখা হবে। তাদের পরিবারের সদস্য যারা দাবি করছেন, তাদের ডিএনএ মিললে মরদেহগুলো তাদের জিম্মায় দেওয়া হবে।

এদিকে, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আটক ইমান উল্লাহ মাস্তানকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না এ আদেশ দেন। এ মামলায় আটক ইমানের বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তাৎক্ষণিক শুনানি না করে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, কারখানাটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। মালিক মো. আকরাম উল্লাহ আকরাম ও তার ছেলে আহনাফ আকিফ আকরামসহ সংশ্লিষ্টরা প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর ধরে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক দিয়ে কারখানাটি পরিচালনা করছিলেন। এজাহারে আরও বলা হয়, একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানাটি বন্ধ ও সিলগালা করলেও আসামিরা পুনরায় গোপনে কার্যক্রম চালু রাখেন। স্থানীয়ভাবে প্রভাব খাটিয়ে ও পেশিশক্তির মাধ্যমে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনায় ইমান উল্লাহ মাস্তানসহ অজ্ঞাতনামা ৫ থেকে ৭ জনের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ বলছে, কারখানাটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না এবং শিশু শ্রমিকসহ বিভিন্ন বয়সী শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করানো হচ্ছিল। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩০২, ৪৩৬ ও ৩৪ ধারাসহ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২৮৪, ২৮৫ ও ২৯০ ধারায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলাম। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

প্রধান ফটকে তালা মারা ছিল: অগ্নিকাণ্ডে আহত হয়ে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ফ্যাক্টরি সুপারভাইজার মো. জিসান শিকদার। জিসানের শরীরের ২২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তার বাবা জসিম শিকদার জানান, আহত জিসান বলেছিল- ‘চারদিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। প্রাণ বাঁচাতে সবাই যে যার মতো করে খুঁজছিল বের হওয়ার পথ। কিন্তু ফ্যাক্টরির প্রধান ফটকে তখন তালা মারা। কোনো উপায় না পেয়ে উঁচু দেওয়াল টপকে কোনোরকমে বাইরে বের হয়ে আসি। বাইরে এসে মাকে সামনে পেয়ে চিৎকার করে বলি- মা, আমাকে বাঁচাও। এরপর আর কিছু মনে নেই’। গতকাল দুপুরে বার্ন ইনস্টিটিউটে কথা বলতে গিয়ে জসিম শিকদার জানান, তাদের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে জিসান সবার বড়। জীবিকার তাগিদে তিনি কেরানীগঞ্জের কদমতলী খালপাড় এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। পেশায় তিনি ভ্যানচালক। তিনি বলেন, সংসারের হাল ধরতেই ছেলে জিসান স্থানীয় ওই কারখানায় চাকরি নেয়। একই এলাকার তার দুই বন্ধু আসিফ (১৫) ও নিরব (১৬) তারাও সেখানে কাজ শুরু করে। জিসান মাসিক ১১ হাজার টাকা বেতনে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, আর তার বন্ধুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। জিসানের পরিবার তার সঙ্গে থাকলেও আসিফ ও নিরব কারখানায়ই থাকতো। জসিম শিকদার আরও জানান, চলতি মাসেই জিসানের পদোন্নতির কথা ছিল। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় এখন পুরো পরিবার দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। তিনি বলেন, জিসান, আসিফ আর নিরব- তিনজন একসঙ্গেই ছিল। জিসান দেওয়াল টপকে বের হয়ে আসার সময় আসিফও বের হতে পেরেছে। কিন্তু নিরবের এখনো কোনো খোঁজ পাইনি। বর্তমানে জিসানের সঙ্গে আসিফও বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।

এদিকে আগুনের ঘটনায় ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স)-কে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।

উল্লেখ্য, শনিবার দুপুর ১টা ১০ মিনিটে কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোলচত্বর এলাকায় গ্যাস লাইটার তৈরির টিনশেড কারখানাতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের চেষ্টায় আড়াইটার দিকে তা নিয়ন্ত্রণে আসে।