- সব ধরনের জ্বালানির তিন মাসের মজুত নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে: জ¦ালানি প্রতিমন্ত্রী
- পেট্রোলপাম্পে তেল সংগ্রহকারীদের আঙুলে অমোচনীয় কালির চিহ্ন
জেট ফুয়েল এবং এলপিজির পর ফার্নেস অয়েলের দাম বড় লাফ দিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতি লিটার ৭০, ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার মতো হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। প্রধানত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে এই তেল ব্যবহৃত হয়। বর্তমান দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১৯ টাকার মতো। দাম বৃদ্ধির হলে ২৭ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
ইরান যুদ্ধের কারণে সব ধরণের জ্বালানির দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। যার কারণে জেট ফুয়েল লিটারে ৯০ টাকা এবং ১২ কেজি এলপিজিতে ৩৮৭ টাকা দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। যদিও গতকাল রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দর নির্ধারণের বৈঠকটি সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন,রোববার ফার্নেস অয়েলের একটা হিসাব নিয়ে বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করতে হবে।পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত দুই ধরণের ফার্নেস অয়েল আমদানি হয়। আমরা যখন গণশুনানি করি তখন দুইটার অনুপাত বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু মার্চে অপরিশোধিত ফার্নেস অয়েল আমদানি করা হয়নি। যে কারণে হিসাবটা নতুন করে ক্যালকুলেট করার বিষয় রয়েছে। আবার বসতে হবে বিষয়টি নিয়ে।
বিইআরসি সুত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যখন ফার্নেস অয়েলের দাম (বিইআরসি প্রথমবার) ঘোষণা করে, প্রিমিয়ামসহ প্লাটস দর ছিল ৩৯৬.৯৬ ডলার। আর মার্চে ৯৬ শতাংশ বেড়ে প্লাটস মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৪২.৭৪ ডলারে। এতে করে প্রতি লিটারে আমদানি খরচ পড়ছে ৮৪.২৪ টাকা। এরসঙ্গে বিইআরসির ট্যারিফ কাঠামোর অনুযায়ী আমদানি শুল্ক, বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানির কমিশনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে দাম দাঁড়ায় ১২১ টাকার মতো।
বিপিডিবি’র একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সরকারতো ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ায়নি। তাহলে ফার্নেস অয়েলের দাম কেনো বাড়াবে বিইআরসি। পেট্রোল-অকটেন ব্যবহার করে তুলনামুলক ধনিক শ্রেণির লোকজন। আর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হতদরিদ্র থেকে সবশ্রেণির লোকজন। এখনই বিদ্যুৎ খাত বিশাল ঘাটতি রয়েছে, দাম বেড়ে গেলে ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। অন্যদিকে বিপিসি ও তাদের বিতরণ কোম্পানিগুলো এতোদিন বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছে। কিছুদিন লোকসান দিলেও তাদের লাভ থাকবে। এছাড়া বিইআরসি যে দর কাঠামো ঘোষণা দিয়েছে, সেখানে আমাদের অনেক আপত্তি রয়েছে। ৮৪ টাকার তেলের সঙ্গে নানা রকম কমিশন যোগ করা হচ্ছে ৩৫ টাকার মতো। এটা স্বচ্ছ ক্যালকুলেশন বলা যায় না।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, আমরা বলেছি আগের আমদানি করা তেলের দাম না বাড়াতে। বাড়তি দামের তেল দেশে আসার পর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে দাম বাড়ালে অর্থবিভাগ থেকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। ভর্তুকি না পেলে তেল কিনতে পারবো না। এতে করে সমস্যা হতে পারে!
তিনি বলেন, শনিবার ফার্নেস অয়েল থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়েছে। আদানির একটি ইউনিট বসে গেছে বয়লারে লিকেজের কারণে। আগামী ১১ তারিখের আগে আসবে না বলে জানিয়েছে।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে গড় উৎপাদন খরচ পড়ছে ১১.৮৩ টাকা, আর বিক্রি করা হয়েছে ৬.৯৯ টাকায় (পাইকারি)।ওই অর্থবছরে ১ লাখ ১ হাজার ১৮৭ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। প্রতি ইউনিটে ৫.৯৯ টাকা হারে ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা।
ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়ে গেলে এই খরচ আরও বেড়ে যাবে। পাশাপাশি গ্যাস সংকট পরিস্থিতিতে আরও জটিল করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস দিয়ে ৪৪.০৯ শতাংশ, কয়লায় ২৬.৭২ শতাংশ, ফার্নেস অয়েলে ১০.৭৩ শতাংশ যোগান এসেছে। গ্যাস দিয়ে উৎপাদনে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়েছে ৭.০৯ টাকা, কয়লায় ১৩.২০ টাকা, ফার্নেস অয়েলে প্রায় ১৯ টাকা, আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে ১৪.৮৬ টাকা, ভারত সরকারের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম পড়েছে ৮.৭১ টাকা এবং সৌর বিদ্যুতের দাম পড়েছে ১৫.৪৬ টাকা। সে কারণে ফার্নেস অয়েলের উৎপাদন বৃদ্ধি মানেই লোকসান বাড়ানো।
তিন মাসের মজুত নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে:
এদিকে সব ধরনের জ্বালানির তিন মাসের মজুত নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।
তিনি বলেন, যাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তারা অনেকেই ফোর্স মেজর (চুক্তি পালন করতে না পারলে দায় মুক্তি সংক্রান্ত ধারা) ডিক্লেয়ার করেছে। এজন্য জ্বালানি সংগ্রহে আমাদের নতুন নতুন উৎস অনুসন্ধান করতে হয়েছে। আমরা কিছু ভালো সোর্স পেয়েছি। তাদের অনেকের সঙ্গে আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। যদি এটা বাস্তবায়ন হয় আমরা প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে আগামী তিন মাসের জ্বালানি সংগ্রহ করার জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এটা ডিজেলের ক্ষেত্রে। আর পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে আনুমানিক তিন মাসের মতো আমরা কিন্তু নিশ্চিত করতে পেরেছি, অর্থাৎ আমাদের কাছে সেটা রেডি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন মাসের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা আমরা নিয়েছি। এপ্রিল মাসের ডিজেলের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহার করি, তাহলে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন থাকবে না। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, পেট্রোল পাম্পে যে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে, তা মূলত অকটেন ও ডিজেলের জন্য। অকটেনের চাহিদা মোট চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ, পেট্রোলেরও প্রায় ৬ শতাংশ অর্থাৎ মোট ১২ শতাংশ। বাকি ৮৮ শতাংশ চাহিদা খুবই স্বাভাবিকভাবে পূরণ হচ্ছে। সে কারণে সামগ্রিক কোনো সংকট আমরা দেখছি না।
তবে কিছু জায়গায় অসৎ উদ্দেশ্যে কিছু ঘটনা ঘটছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার তার মেশিনারিজ নিয়ে কাজ করছে। গতকাল রোববার সকালেও আমরা দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছি। সেখানে আলোচনা হয়েছে কীভাবে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যায়। বিপিসি এবং পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কোম্পানির পক্ষেও যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তা সংশোধন করে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও মসৃণ করার চেষ্টা চলছে, যাতে জনদুর্ভোগ কমে এবং জনগণও দায়িত্বশীল আচরণ করে।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব কিছুদিন থাকতে পারে। সে কারণেই আমরা তিন মাসের জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা করছি। ডিজেলের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হচ্ছে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি। শুধু জ্বালানি আনলেই হবে না, সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে। আমরা সমান্তরালভাবে সেই সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর যেমন বিএডিসি, রেলওয়ে এমনকি প্রয়োজনে বেসরকারি খাতের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর অব্যবহৃত সংরক্ষণ ক্ষমতাও ব্যবহার করা হবে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লেখা চিঠির বিষয় জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রীর একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। সেখানে আমাদের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, আমরা আশাবাদী।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, তিন মাসের মজুত আছে মানে এই নয় যে আমরা এক মাসেই তা শেষ করে ফেলবো। আমাদের একটি নির্ধারিত চাহিদা আছে। এই সময় সাশ্রয়ী হওয়া এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা খুব জরুরি। সরকার যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, শেষে আমি বলতে চাই, এপ্রিল মাসের জন্য ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, এলএনজি, এলপিজি, জেট ফুয়েল এবং ফার্নেস অয়েল সব ধরনের জ্বালানির চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তিন মাসের সংরক্ষণ নীতিও বাস্তবায়নের পথে। পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া চলছে। যারা বোতলে ভরে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত অভিযান চলমান বলেও জানান তিনি।
পেট্রোলপাম্পে তেল সংগ্রহকারীদের আঙুলে অমোচনীয় কালির চিহ্ন :
রংপুরের তারাগঞ্জে জ্বালানি তেল সংকট মোকাবেলায় দেওয়া হচ্ছে আঙুলে অমোচনীয় কালির চিহ্ন। একই ব্যক্তি যেন কৌশলে বারবার তেল নিয়ে মজুত করতে না পারে তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাইকারেরা।
রোববার উপজেলা বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফিলিং স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেলে দীর্ঘ সারি। তেল সরবরাহের আগে যানবাহনের বৈধ কাগজপত্র নিশ্চিত হয়ে চালকের আঙুলে অমোচনীয় কালি দিয়ে চিহ্ন দেওয়া হচ্ছে। এরপরই মিলছে জ্বালানি তেল। ফলে একই ব্যক্তি (চালক) দিনে একাধিকবার জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবেন না।
এদিকে উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় উপজেলায় অবস্থিত মেসার্স তারাগঞ্জ ফিলিং স্টেশন, মেসার্স সোনালী ফিলিং স্টেশন, মেসার্স আর বি ফিলিং স্টেশন, মেসার্স আবুল ফজল ফিলিং স্টেশন ও এরিস্টোক্র্যাট ফিলিং স্টেশনে একযোগে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে করে মোটরসাইকেলের সারি কিছুটা কমেছে।
ফিলিং স্টেশনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় কিছু অসাধু ব্যক্তি একাধিকবার তেল সংগ্রহ করে বাইরে বেশি দামে বিক্রি বা মজুদ করার চেষ্টা করছেন। আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগানোর ফলে সেই সুযোগ অনেকটা কমে এসেছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোনাববর হোসেন বলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকলেই চালকেরা জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন। একজন ব্যক্তি যেন একাধিকবার তেল সংগ্রহ করতে না পারেন, সেজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও বৈধ কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি আঙ্গুলে কালি দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বোতল বা জারে তেল বিক্রি বন্ধ, অবৈধ মজুত রুখে দিতে লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।