খনন কাজ সফল হলে জাতীয় গ্রিডে ১৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার আশা
দেশের সমুদ্রাঞ্চলে জ্বালানি অনুসন্ধানের কাঠামোগত উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’ খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সিসিইএ’র চলতি বছরের ১৩তম সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার ফলে জাতীয় গ্রিডে ১৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী সম্প্রতি সংসদে বলেছিলেন, দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে সরকার ‘অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ ও ‘অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদনের কাজ শুরু করেছে। তার এই বক্তব্যের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী এ সময় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘অনশোর ও অফশোর এলাকায় খনন কাজের সফল সমাপ্তিতে আনুমানিক এক হাজার ৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে।’
সংসদে আলোচনার সূত্র ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। উক্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশীয় উৎস হতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিকল্পে স্বল্প, মধ্য ও দীর্মেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় আগামী ১ বছরে মোট ১১৭টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেট্রোবাংলা কর্তৃক ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২০২২ সাল হতে অদ্যাবধি ২৫টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।’
এদিকে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে মডেল পিএসসি-২০২৬ (উৎপাদন বন্টন চুক্তি) বৃহস্পতিবার অনুমোদন পাওয়ায় চলতি মাসেই সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চায় সরকার।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করলেও কোন প্রতিষ্ঠানই দরপত্র জমা দেয়নি। যে কারণে পরিত্যক্ত করা হয় ২০২৪ এর বিডিং রাউন্ড। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোঃ এরফানুল হক বলেছেন, আমরা প্রস্তুত, সরকারের সিগন্যালের অপেক্ষা করছি।
সর্বশেষ মডেল পিএসসি-২০২৩ এর আলোকে ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মার্কিন কোম্পানি এক্সোন মবিলসহ ৭টি আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা কোম্পানি দরপত্র কিনেছিল, ২টি কোম্পানি পেট্রোবাংলা থেকে ডাটাও কিনেছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে দরপত্র জমাদান থেকে বিরত থাকে।
অন্তবর্তীকালীন সরকার কারণ উৎঘাটন কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইনের খরচ, ডব্লিউপিপিএফ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করাসহ বেশকিছু সংশোধনী আনা হয়েছে।
মডেল পিএসসি-২০১৯ থেকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ অনেক ছাড় দিয়ে পিএসসি-২০২৩ চুড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয় ব্রেন্ট ক্রডের ১০ শতাংশ দরের সমান। যা আগের পিএসসিতে যথাক্রমে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে ৫.৬ ডলার ও ৭.২৫ ডলার স্থির দর ছিল। মডেল পিএসসি ২০২৩ এর মতোই সংশোধনীতেও কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। অথচ অতীতে খসড়া উন্মুক্ত করে জনগণের মতামত নেওয়ার রেওয়াজ ছিল।
আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মায়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সাগর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের। সেই সম্ভাবনাময় সাগরাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে বিগত সরকার। একই পথে হেটেছিল অন্তবর্তীকালীন সরকারও। যে কারণে অধরাই থেকে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় জলরাশি। বাংলাদেশের পাশের অংশ থেকে মায়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস উত্তোলন করছে। যে কারণে বাংলাদেশে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক আছে। ২০০৮ সালে ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ এর জন্য আমেরিকান কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। কনোকো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ কিছু শর্ত সংশোধনের আবেদন করে। বাংলাদেশ সেই শর্তে সাড়া না দিলে ২০১৪ সালে ছেড়ে চলে যায়। অন্যদিকে অফসোর বিডিং রাউন্ড ২০১২ আওতায় ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড এসএস-৪ ও এসএস-৯ এর চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ওএনজিসি ভিদেশ কাঞ্চন-১ কূপ খনন করেছে, আরও দু’টি অনুসন্ধান কূপ খনন করবে।
২০১৭ সালে এসএস-১২ ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ২০২০ সালে ব্লক ফেলে চলে যায় পসকো দাইয়ু। ২০২৪ সালের আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে পিএসসি আপডেট করা হলেও দরপত্র ডাকা হয়নি। কয়েক মাসের কাজ পিএসসি (উৎপাদন ও বন্টন চুক্তি) আপডেট করতেই ৫ বছর সময় পার করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।
মডেল পিএসসি ২০০৮ প্রণয়ন কমিটির প্রধান মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী মনে করেন, অনেকে মনে করেছিলেন গ্যাসের দাম বাড়ালেই কোম্পানিগুলো দৌড়ে আসবে। সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেনো জমা হয়নি সেটা তালাশ করার পাশাপাশি কেনো মাত্র ৭টি কোম্পানি দরপত্র কিনেছে সেটাও দেখা দরকার। পিএসসিতে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে, এখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে দৈনিক ২০ হাজার ব্যারেল (তেলের সমান) গ্যাস উত্তোলন করে এমন কোম্পানি দরপত্র কিনতে পারবে। এখানেইতো অনেক কোম্পানি বাদ পড়ে গেছে। আমি মনে করি গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ১০ হাজার এবং অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে ৫ হাজার ব্যারেল হওয়া উচিত। তাহলে আরও অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিতে পারবে।
তিনি বলেন, আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে ডাটা প্যাকেজের দাম অনেক বেশি। কোন কোন প্যাকেজের দাম মিলিয়ন ডলারের মতো। অন্য দেশে এসব ডাটা ফ্রি দেয়। ১৯৭৪ সালে আমাদের দেশে এসব ডাটা উন্মুক্ত ছিলো, তখন অনেক বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছিলো।
বাংলাদেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। সহসা এই সংকট দূর হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দিনদিন বেড়েই চলেছে সংকট।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে দৈনিক অনুমোদিত লোড রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, প্রকৃত চাহিদা ধারণা করা হয় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়নের মতো।
বাড়ন্ত চাহিদার বিপরীতে প্রতিনিয়ত কমছে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন। এক সময় ২৮০০ মিলিয়ন উৎপাদন হলেও এখন ১৫৮৩ মিলিয়নে (৫ মে) নেমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ বিবেচনা করা হয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতাকে। অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতে মনযোগ বেশি ছিল বিগত সরকারগুলোর।
স্থলভাগে কূপ খনন করেও বড় রিজার্ভ পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বাড়ানো দূরের কথা বর্তমান উৎপাদন অব্যাহত রাখাই কঠিন মনে করা হচ্ছে। একমাত্র ভরসা হচ্ছে গভীর সমুদ্র। যতো দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা যাবে ততই মঙ্গল মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। সিদ্ধান্ত নিতে আড়াই মাস কেনো লাগলো এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।