বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও আমদানিনির্ভরতার চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘এনার্জি ট্র্যাপ’ বা জ্বালানি ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, চাহিদা-নির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং যোগাযোগ ঘাটতির সমন্বয়ে সংকটের তীব্রতা বেড়েছে। শুরুর দিকের কিছু ত্রুটি দ্রুতই প্যানিক বায়িংয়ে রূপ নেয়, ফলে অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। রেশনিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

গতকাল শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ’জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এই আলোচনা করা হয়। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এ. সত্তার মন্ডল, ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল (টিএসআই)-এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ এবং বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।

দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান বলেন, ‘জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো আরও প্রকট হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মজুত ক্ষমতা কী পরিমাণ আছে, কতদিনের জন্য আমরা মজুত রাখতে পারি এই প্রশ্নটা উঠছে। এনার্জির এই দাম ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটের সাথে সমন্বয় করে আজ হোক কাল হোক বাড়াতেই হবে আর এই প্রক্রিয়া চলবেই। কিন্তু যতই দাম বাড়ুক বা কমুক আমাদের দরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা। আমাদের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ওভারফ্লো করার মতো পরিস্থিতি নেই যে পরিমাণ তেল আসবে বা যাবে।’

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে জ্বালানির সংকট চলছে, যা আমরা মোকাবিলাও করছি। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়া, আমদানি ব্যবস্থাপনা ও মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে এ সংকট আরও গভীরভাবে থেকে যাবে, এমনকি বারবার ফিরে আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো একমাত্রিকভাবে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। নীতিগত সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের আরও তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। ম্যাসেজিংয়ের দুর্বলতার কারণে নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে। আমরা প্যানিক ও মজুতের বিষয় শুনেছি, যা অন্য প্রক্রিয়ায় ম্যানেজ করা হয়েছে। তবে ম্যাসেজিংয়ের ক্ষেত্রেও সমন্বয় দরকার।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এ সত্তার মন্ডল মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, কৃষির মাসল পাওয়ার এখন অনেকটাই মেশিন পাওয়ার দ্বারা রিপ্লেস হয়েছে। প্রায় ৪২ লাখ ডিজেল ইঞ্জিন কৃষিতে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু সেচ নয়, কৃষি সেক্টরে ছোট-বড় নানা ধরনের ইঞ্জিন চালু রয়েছে। আগামী দিনে কৃষিখাতে এসব মেশিনের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং সেই অনুপাতে ডিজেলের চাহিদাও বাড়বে।

ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের (টিএসআই) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৫ ডলার বাড়লে আমাদের ৪০০-৫০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এই বাড়তি আর্থিক চাপ পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর পড়ে। তাই আমাদের বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবতে হবে। আগে আমাদের সোর্সিং মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ছিল, এখন অন্য জায়গাতেও সেই সোর্সিং বাড়ানো যায় কি না তা দেখতে হবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, আমি মনে করি আগামীতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে গড়াতে পারে এবং বাংলাদেশের জন্য এনার্জি সিকিউরিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনার্জি সেক্টরকে সুরক্ষিত করতে শর্ট, মিড ও লং টার্ম পলিসি নিতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে কয়লাভিত্তিক বেইজ প্ল্যান্টগুলো সক্ষমতার ভিত্তিতে চালানো উচিত। আদানি ও ভারত থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ আসে, তা দিয়েও আমাদের ডোমেস্টিক সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। এছাড়া গ্যাস সরবরাহ শিল্প ও সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবহারের বিষয়টিও দেখতে হবে।

বিকল্প জ্বালানি ও গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো অপরিহার্য। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন রিনিউএবল এনার্জির রিসোর্সগুলো কাজে লাগাতে হবে আর গ্যাসের ক্ষেত্রে কূপ খননের জন্য জোর দিতে হবে। তবে আশার আলো এই যে এই সরকার আসার পর ১৪০টি কূপ খননের কাজ শুরু করেছে।

আলোচনায় সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খোদা বকশ চৌধুরী। তিনি বলেন, এবার মানুষ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। সাধারণত এমন সংকটে তা দেখা যায় না। নতুন সরকারের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ছিল। তবে ভবিষ্যতে এমন সংকট এলে মানুষ এমন সহনশীল থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

তিনি বলেন, এবার মানুষ ভীতি বা আতঙ্ক থেকে তেল কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে মজুত প্রবণতার কারণেও সংকট তৈরি হয়েছিল বলে মনে করছেন পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক। তিনি বলেন, একই লোক প্রতিদিন তেল নিয়েছে, এমন নজিরও দেখা গেছে। আবার সরবরাহ কমিয়ে দিলে লম্বা লাইন পড়ে যায়। এখন সরবরাহ ও দাম উভয়ই বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতা কমে গেছে।