- ব্রিকস মঞ্চের পার্শ্বঅনুষ্ঠানে কেবল করমর্দন বা ফটোসেশন করে দেশে ফেরাকে রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ মনে করছে না ঢাকা
জুলাই বিপ্লবপরবর্তী বাংলাদেশ এবং গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-নয়াদিল্লী সম্পর্ক এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও ভূরাজনৈতিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জুলাই গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, দিল্লীর মাটিতে দাঁড়িয়ে তার বিতর্কিত রাজনৈতিক বক্তব্য, সীমান্তে পুশইন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং সর্বোপরি চীনের সঙ্গে ঢাকার বাড়তে থাকা কৌশলগত সম্পর্কের আবহে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে তড়িঘড়ি ভারতে নিতে তৎপরতা শুরু করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। দিল্লী থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে; প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এলে তিনি ‘অখুশি হয়ে ফিরবেন না’; ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং শহীদ ওসমান হাদীর সন্দেহভাজন ঘাতককে হস্তান্তরেও তৈরি নয়াদিল্লী। ঢাকা-দিল্লীর কূটনৈতিক সূত্রগুলো এমনই আভাস দিচ্ছেন। তবে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এটি কি দিল্লীর কোনো প্রকৃত অবস্থান পরিবর্তন, নাকি বাংলাদেশকে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপে রাখার এক নতুন ‘ডুয়েল গেম’? দিল্লী কেন অতি-আগ্রহী? নাকি ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের ব্যাকফত কূটনীতি।
এদিকে জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে (৫ আগস্ট ২০২৬) ভারতের মাটিতে বসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিতর্কিত প্রেস ব্রিফিং এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের “বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় পাকিস্তান” কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের উসকানিমূলক মন্তব্য ঢাকা-দিল্লী সম্পর্কে নজিরবিহীন উত্তাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যে কঠোর প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়, তা বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কড়া কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়, “বাংলাদেশ আর কখনো কারো করদ রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।” এই কঠোর বার্তার পর দিল্লীর সাউথ ব্লক রীতিমতো আত্মপক্ষ সমর্থনে বাধ্য হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দ্রুত সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ওই প্রেস ব্রিফিংয়ের পেছনে ভারত সরকারের কোনো হাত ছিল না এবং ভারত হাসিনার বক্তব্যকে সমর্থন করে না।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ভারতে নীতি-নির্ধারকরা এখন বুঝতে পারছেন; বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কেবল ‘হাসিনা কার্ড’ খেলে চললে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত চরম বিচ্ছিন্নতায় পড়বে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীন ও মালয়েশিয়া নির্বাচন করাকে দিল্লী নিজেদের জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে দেখছে।
ঢাকা-দিল্লী সম্পর্কের চলমান অস্থিরতা ও সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার রেখেছে। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের সফল সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব মূলত ভারতের। গণহত্যা ও একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং শহীদ ওসমান হাদীর খুনিসহ ভারতে আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা। করদ রাষ্ট্র নয়, বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সকল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তি তৈরি হওয়া।
এদিকে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনের ‘আউটরিচ সেশন’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লীকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, বহুপাক্ষিক মঞ্চের পার্শ্বঅনুষ্ঠানে কেবল করমর্দন বা ফটোসেশন করে দেশে ফেরাকে রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ মনে করছে না ঢাকা। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি বলেন, “ভারত সফর নিয়ে তড়িঘড়ি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সফর হতে পারে, সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে। তবে এটি নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংসদীয় ব্যস্ততা এবং দুই দেশের মধ্যকার আলোচনার অগ্রগতির ওপর। উভয় দেশের সুবিধাজনক সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণে ভারত সরকারের ভেতরের একাধিক সংস্থা ও গোষ্ঠী এখন দ্বিমুখী ও দ্বিধাবিভক্ত নীতি গ্রহণ করছে। সাউথ ব্লকের পেশাদার কূটনীতিকরা মনে করছেন, নতুন ঢাকার সঙ্গে অনতিবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তোলা দরকার। অন্যদিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল, গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি অংশ এবং শাসক দল বিজেপির কট্টরপন্থীরা এখনো হাসিনাকে ঢাকার ওপর চাপ সৃষ্টিকারী হাতিয়ার বা ‘লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। দিল্লীর এই বিভ্রান্তিকর নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভারতের সাবেক কূটনীতিকদের মন্তব্যেও।
একদিকে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও রীভা গাঙ্গুলী দাস ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সরাসরি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নানা রাজনৈতিক দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন; অন্যদিকে ভারতের মূলধারার জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও থিংকট্যাংকগুলো ভিন্ন সুর গাইছেন। দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক নিবন্ধে সতর্ক করে লিখেছেন, “বাংলাদেশে ২০২৪-পরবর্তী পরিবর্তন নয়াদিল্লীর জন্য বড় ধাক্কা হলেও শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে। একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে জিম্মি করা মোটেও উচিত হবে না।”
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহার করতে দেওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়। কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষা করাই ভারতের আসল স্বার্থ।
তড়িঘড়ি সফর কি আত্মঘাতী হবে? বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে প্রবল সতর্কতা জারি করেছেন। তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট ফলাফল ছাড়া শুধু মিষ্টি কথার আশ্বাসে দিল্লী সফর করা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, “এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লী সফরে নেওয়া সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কৌশল ও স্বার্থের অংশ। ভারত এখন ডাবল গেম খেলছে; একদিকে মুখে বলছে সম্পর্ক ভালো করতে চায়, অন্যদিকে হাসিনাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ঝুলিয়ে রাখছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ছাড়া এখন দিল্লী যান, তবে ভারত অবশ্যই চীনের সাথে আমাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন নিয়ে মারাত্মক আপত্তি তুলবে। বাংলাদেশের উচিত হবে আগে ভারতের কাছে চাওয়া; আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক বা পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপ্তি ঘটাব, তাতে দিল্লীর কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। এর বাইরে তিস্তা পানিবণ্টন ও সীমান্ত হত্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক অগ্রগতি ছাড়া এই মুহূর্তে দিল্লী সফর কূটনৈতিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত হবে।”
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের তাৎপর্য হলো এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিভাবে এবং কতটা লাভবান হবে কিংবা বাংলাদেশের স্বার্থ কী পরিমাণ সংরক্ষিত হবে আগেভাগেই তার হিসাবনিকাশ করা। মোদি সরকারের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হওয়া একদমই ঠিক হবে না। ভারত এখনো জুলাই বিপ্লবের বাস্তবতাকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। দীনেশ ত্রিবেদী যেদিন ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করছিলেন, তার ঠিক আগের দিনও সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হয়েছে। এক হাতে তারা সীমান্ত হত্যা আর ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবে, আর অন্য হাতে হ্যান্ডশেক করতে চাইবে; এভাবে কূটনীতি চলে না। শুধু প্রলোভন বা মৌখিক আশ্বাসে কাজ হবে না। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন (যা ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে), তিস্তা চুক্তি, পুশইন বন্ধ, সীমান্ত হত্যা রোধ এবং ভারতে পালিয়ে থাকা অভিযুক্তদের হস্তান্তরে ভারত কার্যকর কী আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে; তা নিশ্চিত করেই সফরের তারিখ নির্ধারিত হওয়া উচিত। অন্যথায় এই সফর রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য ভুল হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জনগণের অনুভূতি ও জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষাকে দূরে রেখে ভারতের প্রতি কোনো প্রকার নতজানু বা তড়িঘড়ি কূটনীতি পরিচালনা করা বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। ঢাকার কূটনৈতিক নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে দিল্লীর মৌখিক আশ্বাসে বিভ্রান্ত না হয়ে দ্বিপক্ষীয় প্রধান প্রধান সমস্যার বাস্তবমুখী সমাধান টেবিলে তোলা। হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে বার্তাই পাঠান না কেন, বাংলাদেশকে নিজের সার্বভৌম ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট রাখতে হবে। গঙ্গার পানিবণ্টন, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দিল্লী কতটা বাস্তবসম্মত অগ্রগতি দেখায়; তার ওপরই নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন দিল্লী সফরের সার্থকতা ও যৌক্তিকতা।