মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য নতুন সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবসহ অন্তত ১২টি দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন। এদিকে হরমুজ প্রণালী দখলে ট্রাম্পের মিত্র জোটের প্রতি আহ্বান জানালেও ফ্রান্স তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া সৌদি, আমিরাত, ইরাক ও কুয়েতে তিন মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। এছাড়া ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এক মার্কিন সিনেটর। ইরানের একটি হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন অবকাঠামোগুলোকে বিপর্যস্ত করেছে। বিশেষ থার্ড রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস একটি বড় আঘাত। এপি, মিডল ইস্ট আই, জি নিউজ, আল জাজিরা।

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সৌদি আরবসহ ১২ দেশ থেকে নাগরিকদের সরতে বলল যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য নতুন সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনা, বিচ্ছিন্ন হামলা ও সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবসহ অন্তত ১২টি দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত দেশটি ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেখান থেকে দেওয়া সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, ‘যত দ্রুত সম্ভব ইরাক ত্যাগ করা উচিত।’ দূতাবাস আরও জানিয়েছে, যারা এখনো দেশটিতে অবস্থান করছেন তাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ইরান নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে ওমান থেকেও জরুরি নয় এমন মার্কিন সরকারি কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে। এদিকে উত্তেজনার পটভূমিতে নতুন করে সামরিক ঘটনার খবরও সামনে এসেছে।

মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, তারা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উদ্ভূত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় আকাশপথের যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মূলত ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাবে পুরো অঞ্চলে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

থার্ড রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস

ইরানের একটি সমন্বিত হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোগুলোকে বিপর্যস্ত করেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে এবং প্রধান ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে। যদিও ঘাঁটিগুলো এখনও সচল আছে, তবে এই ক্ষয়ক্ষতি ইরানি সমরাস্ত্রের এক বিপজ্জনক বাস্তবতা উন্মোচন করেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে ওইদিনই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র দেশ ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। পাল্টা হামলায় জর্ডান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের গুরুত্বপূর্ণ রাডার ঘাঁটিতে আঘাত হানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। এসব ধ্বংসযজ্ঞের ছবি স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে।

উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি কুয়েত আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি: ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হওয়া হামলায় এক ডজনেরও বেশি স্থাপনা, বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং রানওয়ের পাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী দখলে ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান ফ্রান্সের

হরমুজ প্রণালীর দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের অবরোধ ভাঙতে ‘অনেক দেশ’ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। অন্যদিকে ফ্রান্স স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ১৫তম দিনেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শনিবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন, ইরানের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে কাজ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এই জোটে যোগ দেবে। ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবর পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ফ্রান্সের সোজাসাপ্টা ‘না’

ট্রাম্পের এই আহ্বানের পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ১০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়ার খবর পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবরোধ ভাঙতে ‘অনেক দেশ’ নিয়ে জোট গড়ে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর দাবি করলেও ফ্রান্স তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করবে না এবং তাদের বিমানবাহী রণতরী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধের ১৫তম দিনেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা ও শঙ্কা বৃদ্ধি করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ফরাসি মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘না। বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে। ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত : রক্ষণাত্মক, সুরক্ষামূলক।’ ফ্রান্সের এই বক্তব্য ট্রাম্পের কথিত ‘মিত্র জোট’ গঠনের দাবির মুখে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘কোনো আমেরিকান জাহাজ নয়’

ট্রাম্প একই পোস্টে দাবি করেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতার ১০০% ধ্বংস করে দিয়েছে।’ যদিও পরক্ষণেই তিনি স্বীকার করেন, ‘ইরান এখনও জলপথে ড্রোন, মাইন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।’ ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তীররেখা বরাবর বোমাবর্ষণ করবে এবং ইরানি নৌকা ও জাহাজগুলোকে গুলী করে উড়িয়ে দেবে।’

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের আইআরজিসি-র নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালী এখনও সামরিকভাবে বন্ধ করা হয়নি এবং এটি কেবল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’ তিনি ট্রাম্পের দাবিকে মিথ্যা বলে সমালোচনা করেন।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালীটি দিয়ে জাহাজগুলোকে এসকর্ট করার জন্য প্রস্তুত নয়।’ অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করেন যে, প্রণালীটি কেবল শত্রু এবং তাদের মিত্রদের ট্যাংকার ও জাহাজের জন্য বন্ধ।’ অন্যদিকে, ইরানের সুপ্রিম লিডারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী সংস্থা এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মহসেন রেজাই বলেন, ‘কোনো আমেরিকান জাহাজের উপসাগরে প্রবেশের অধিকার নেই।’

এরই মধ্যে ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর ইরান তাদের জাহাজগুলোকে বিরল ছাড় দিয়েছে। এলপিজি বহনকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ট্যাংকার এবং একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজ নিরাপদে প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা নিশ্চিত করেছেন যে, দুটি ভারতীয় ট্যাংকার নিরাপদে প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফলেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজকেও একইভাবে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আঙ্কারা সরাসরি তেহরানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে এবং পথটি তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। জানা গেছে, আরও ১৪টি তুর্কি জাহাজ এখনও ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।

হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠানো নিয়ে দ্বিধায় জাপান

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে জাপান। দেশটির ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) নীতি নির্ধারণী প্রধান তাকায়ুকি কোবায়াশি এই পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বাধাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাপানসহ বিভিন্ন দেশকে তাদের নিজস্ব ট্যাঙ্কারগুলোর পাহারায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানানোর পর জাপানের পক্ষ থেকে এই প্রতিক্রিয়া এল। জাপানের পাবলিক ব্রডকাস্টার এনএইচকে-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোবায়াশি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে নৌবাহিনী পাঠানো জাপানের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত।

কোবায়াশি বলেন, বিদ্যমান জাপানি আইন অনুযায়ী ওই অঞ্চলে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানোর শর্ত বা মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে আইনিভাবে এই সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ করে দেওয়া না গেলেও চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। মূলত জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান এবং বিদ্যমান সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সরাসরি কোনো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা টোকিওর জন্য রাজনৈতিক ও আইনিভাবে বেশ জটিল। ফলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জোরালো আহ্বান থাকলেও, সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের পরিবর্তে জাপান এখন পর্যন্ত অত্যন্ত রক্ষণশীল ও সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থানেই অনড় রয়েছে।

শঙ্কায় আমিরাতের ‘হরমুজ প্রণালী’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ফুজাইরাহ’তে শনিবারের (১৪ মার্চ) ড্রোন হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের পর তেল উত্তোলন, সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছিল। তবে এরইমধ্যে বন্দরটির কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে বলে জানিয়েছে । এই বন্দরটি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহ এবং অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি রপ্তানির জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তেল সরবরাহের সক্ষমতার কারণে ফুজাইরাহ বন্দরকে আমিরাতের ‘হরমুজ প্রণালী’ ভাবা হয়। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পালটা জবাবে ইরানের হামলায় শঙ্কায় পড়েছে বন্দরটি।

বৈশ্বিকভাবে ফুজাইরাহ কেন গুরুত্বপূর্ণ

গত বছর ফুজাইরাহ বন্দর থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৭ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে কেপ্লার (কঢ়ষবৎ)। এই পরিমাণ বিশ্বে দৈনিক মোট তেল চাহিদার প্রায় ১.৭ শতাংশের সমান।

বন্দরটি অবস্থিত ওমান উপসাগরের তীরে এবং হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে। বর্তমানে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক বাজারে ফুজাইরাহ বন্দরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

২০২৫ সালে এই বন্দর থেকে প্রায় ৭.৪ মিলিয়ন ঘনমিটার (প্রায় ৭.৩৩ মিলিয়ন টন) সামুদ্রিক জ্বালানি বিক্রি হয়েছে। এর ফলে এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সামুদ্রিক জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র— সিঙ্গাপুর, রোটার্ডাম এবং চীনের ঝৌসানের পরেই এর অবস্থান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এর গুরুত্ব

যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিদিন ৩৪ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করত। দেশটির একটি ১৫ লাখ ব্যারেল দৈনিক ক্ষমতার পাইপলাইন রয়েছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল পরিবহন করা সম্ভব।

আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপালাইন (এডিসিওপি), যা হাবশান-ফুজাইরাহ নামেও পরিচিত, আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে ফুজাইরাহ বন্দরে তেল পরিবহন করে। এখান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনপ্রিয় ক্রুড গ্রেড মুরবান তেল রপ্তানি করা হয়, যার বড় ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলো।

হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ হয়ে থাকায় ফুজাইরাহ বন্দরে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশটিকে উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে হতে পারে।

তেল ও জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব

ফুজাইরাহ বন্দরের মোট সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ও জ্বালানি সংরক্ষণ ও মিশ্রণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। তেল শিল্পে ‘ব্লেন্ডিং’ বলতে বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম উপাদান মিশিয়ে নির্দিষ্ট মানের চূড়ান্ত পণ্য যেমন: পেট্রোল বা জাহাজের জ্বালানি তৈরি করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

বন্দরে বিশ্বের বড় বড় স্টোরেজ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম রয়েছে, যেমন: ভিটিটিআই, ভিটল,অ্যাডনক এবং ভোপাক এ ছাড়া ফুজাইরাহ তেল শিল্প অঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক পরিশোধিত জ্বালানি সংরক্ষণ সুবিধা রয়েছে।

ইসরাইলে গত ২৪ ঘণ্টায় শতাধিক ব্যক্তি আহত

ইসরাইলের একটি এলাকায় রকেট হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শনে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ১৫ মার্চ ২০২৬ছবি: এএফপি ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে গত ২৪ ঘণ্টায় আহত ১০৮ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পত্রিকা থেকে এ তথ্য জানা গেছে। পত্রিকাটি বলেছে, এ ১০৮ জনের আহত হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য মন্ত্রণালয় দেয়নি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট হামলার জেরে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আহত হয়ে থাকতে পারেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে ইরান। ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ রোববার সকাল পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ১৯৫ জন ইসরাইলিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে এখন ৮১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নেতানিয়াহুকে হত্যার হুমকি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিশানা করার অঙ্গীকার করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসির নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু সম্পর্কে বলা হয়, ‘আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাকে ধাওয়া ও হত্যা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।’ দুই সপ্তাহ আগে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের ডাক দিয়ে দেশটির সঙ্গে এ যুদ্ধ শুরু করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন অর্থাৎ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হন দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় পুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে নেতানিয়াহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের বিরুদ্ধে ইসরাইল কী ব্যবস্থা নিতে পারে? জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি এই ‘‘সন্ত্রাসী’’ নেতাদের কারোরই জীবনবিমার নিশ্চয়তা দেব না।’

ইরানের ইসফাহানে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নিহত অন্তত ১৫ ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ ইসফাহানের বেশ কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইরাক ও কুয়েতে তিন মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবি ইরানের

ইসরাইলের পাশাপাশি ইরাক ও কুয়েতে অবস্থিত তিনটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরাইলে ‘অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের অবিরাম শব্দ’ এবং হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষের স্বীকারোক্তিই বলে দিচ্ছে যে তেল আবিবের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইরানের ভারী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কতা শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত হারির মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা আলি আল সালেম ও আরিফজান ঘাঁটি ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

সৌদি-আমিরাতেও হামলা

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লক্ষ্যে আঘাত হানার আগেই রিয়াদের আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

রবিবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শনিবার রাতে ইরানের ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৪টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। আরব নিউজ, এক্স পোস্টে, রয়টার্স, সিএনএন, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস অব ইসরাইল, এপি, মিডল ইস্ট আই, জিও নিউজ ।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির আবাসস্থল আল-খার্জের আকাশে ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই ভূপাতিত করা হয়েছে। এছাড়া বেশিরভাগ ড্রোন পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের প্রতিরোধ করা হয়েছে, যেখানে প্রধান তেল শোধনাগারগুলো অবস্থিত। আর কিছু ভূপাতিত করা হয়েছে রিয়াদে।

রবিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হুমকির জবাব দিচ্ছে। শনিবার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৩টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

দুবাই মিডিয়া অফিস এক্স-এ পোস্ট করে জানিয়েছে, মারিনা এবং আল-সুফৌহ এলাকায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে কাজ করেছে। ফলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরান আমিরাতের তিনটি প্রধান বন্দর খালি করার আহ্বান জানিয়েছে, যা প্রথমবারের মতো কোনও প্রতিবেশী দেশের অ-মার্কিন সম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক্স-এ আরও জানিয়েছে যে, হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটি ২৯৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৬০০ ড্রোন ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে এই সময়ে ছয়জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।