ঈদযাত্রায় বাসের টিকিট বিক্রিতে চরম নৈরাজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ যাত্রায় যাত্রীদের জিম্মি করে বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে পরিবহন কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে এসি বাসগুলোতে ৭ দিনের ব্যবধানে ভাড়ার এই বিশাল পার্থক্য দেখা গেছে। পরিবহন মালিকরা ফিরতি পথে যাত্রী সংকটের অজুহাত দিলেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা একে অযৌক্তিক বলছেন। এমন অবস্থায় ঈদে ঘরমুখো মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
দেশের বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া অনলাইনে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একই গন্তব্যে একই মানের বাসে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভাড়া বাড়ানোর এই বিষয়টি নিয়ে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি দাবি করেছে, নন-এসি বাসে ভাড়া বাড়ানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই এবং জ্বালানি সংকটের সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। সংগঠনটি জানিয়েছে, কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ দাবি জানান। সংগঠনটি বলছে, ঈদযাত্রায় বিভিন্ন পথের গণপরিবহনে একদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে, অন্যদিকে নতুন সড়কমন্ত্রী পুরোনো সড়কমন্ত্রীর স্টাইলে মিডিয়া ও মালিক সমিতির লোকজন সঙ্গে নিয়ে বাস র্টামিনাল পরিদর্শনের আইওয়াশ চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনতিবিলম্বে কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-বুড়িমারি রুটে ঢাকা থেকে রাত ৯টায় ‘প্রিমিয়াম স্লিপার এসি’ বাস চালায় ‘বরকত ট্রাভেলস’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১৫০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ৩০০০ টাকা
অন্যদিকে, বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছেন, যাত্রীরা যেন তাকে এ বিষয়ে জানান এবং এর প্রতিকারের দায়িত্ব তিনি নিজেই গ্রহণ করবেন।
অনলাইনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা–বুড়িমারি রুটে ঢাকা থেকে রাত ৯টায় ‘প্রিমিয়াম স্লিপার এসি’ বাস চালায় ‘বরকত ট্রাভেলস’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১৫০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ৩০০০ টাকা।
ঢাকা-কাউনিয়া-তিস্তা রুটে ঢাকা থেকে রাত সাড়ে ৯টায় ‘লাকসানা বিজনেস ক্লাস এসি’ বাস চালায় ‘শাহ আলী পরিবহন’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ২৫০০ টাকা।
ঢাকা-লালমনিরহাট রুটে ঢাকা থেকে রাত ১০টা ২০ মিনিটে ‘ইকোনমি ক্লাস এসি’ বাস চালায় ‘এস.আর ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেড’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১০০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ১৬০০ টাকা।
ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে ঢাকা থেকে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে ‘ইকোনমি ক্লাস এসি’ বাস চালায় ‘শ্যামলী পরিবহন’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১০০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ১৬০০ টাকা। একই রুটে ঢাকা থেকে রাত ৮টা ১০ মিনিটে ‘হিনো ওয়ান,জে নন-এসি’ বাস চালায় ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে করা হয়েছে ১২০০ টাকা।
ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ঢাকা থেকে দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে ‘বিজনেস কাম স্লিপার বাস–এএল/১২এম, এসি’ মডেলের বাস চালায় ‘এভারগ্রিন ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড’। এই বাসের প্রতিটি আসনের গত ১০ মার্চের ভাড়া ছিল ৯০০ ও ১১০০ টাকা। সেই ভাড়া ঈদের আগে আগামী ১৮ মার্চের ট্রিপে উভয় ক্ষেত্রেই করা হয়েছে ২০০০ টাকা।
পাবনা গামী বাসের যাত্রী মারুফ হাসান বলেন, ঢাকা-পাবনা রুটে সি-লাইন পরিবহন নন-এসি বাসে নিয়মিত ৫০০ টাকা করে ভাড়া নিয়ে থাকে। গতকাল দুটি আসনের ভাড়া নিয়েছে ১৩০০ টাকা। অর্থাৎ অন্যান্য সময়ের তুলনায় আসনপ্রতি ১৫০ টাকা করে বেশি নিয়েছে। ঈদ এলেই সব পরিবহন ভাড়া বাড়ায় এবং যাত্রীদের জিম্মি করে।
ঢাকা-রাজশাহী রুটে আগামী ১৮ মার্চের টিকিট কেটেছেন গোলাম মর্তুজা। তিনি বলেন, ঈদে রাজশাহী যাওয়ার জন্য এভারগ্রিন পরিবহনে ২০০০ টাকা করে টিকিট কিনেছি, যা নিয়মিত ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি। আগে এই ভাড়া ছিল ১১০০ টাকা। উৎসবের সময় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। এটি পকেট কাটা ছাড়া আর কিছু না।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান. আমরা বলেছি কোনো অবস্থাতেই কারণ ছাড়া, সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এবং নির্ধারণ করা ছাড়া কোনো ভাড়া বাড়ানো যাবে না। আমি মালিকদের বলেছি তেলের দাম বাড়বে না, তেল সরবরাহ নিশ্চিত হবে। অতএব টিকিটের দাম বাড়ানো যাবে না। বিক্রিত টিকিট ফেরত দেওয়া যাবে না। তারা বিষয়টিতে একমত হয়েছে
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম মনে করেন, তেল সংকটের সঙ্গে বাসের ভাড়া বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তেলের দাম বাড়লে যদি বিআরটিএ মিটিং করে জানায়, তখনই কেবল ভাড়া বাড়তে পারে। এই ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি। কোনো অবস্থাতেই কেউ কৌশলে যাত্রীদের হেনস্তা বা জিম্মি করবে, এটা হতে দেওয়া হবে না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের পুরোনো পদ্ধতি বিদ্যমান, সরকার কাঠামোগত পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে পারেনি, আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিবহনগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি, ছদ্মবেশে সন্ধ্যার পর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, গাবতলী, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীবেশে টিকিট কাটতে আসুন। মানুষের হয়রানির প্রকৃত চিত্র দেখুন। প্রয়োজনে আপনার দলের তৃণমুল নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য নিন।
এবার ঈদুল ফিতরে যাত্রীরা যাতে কোনোভাবে হয়রানি না হন সেদিকে খেয়াল রেখে প্রত্যেকটি বাস কাউন্টারে ভাড়ার চার্ট টানিয়ে রাখার জন্য বাস সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ সরওয়ার।শনিবার রাজধানীর গাবতলীতে গণপরিবহন চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ সরওয়ার বলেন, ঈদের সময় কাউন্টারগুলোতে ভাড়ার চার্ট টানিয়ে রাখতে হবে। যেকোনো লক্কর-ঝক্কর বাস রাস্তায় যাতে না নামে সেজন্য মোবাইল কোর্ট চলবে।
তিনি আরো বলেন, এবার যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে বাস টার্মিনালগুলোতে হেল্প ডেস্ক করা হয়েছে। আমরা এই হেল্পডেস্কগুলোতে ভাড়ার চার্ট টানিয়ে দেবেন। যাতে প্রত্যেক যাত্রী জানে কী পরিমাণ ভাড়া দিতে হবে।