মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বন্ধ হরমুজ প্রণালী। এতে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কাতারসহ অন্যান্য দেশগুলো থেকে সময়মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এমতাবস্থায় দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় দুই কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। আগামী ১৫ অথবা ১৬ মার্চ এক কার্গো এবং ১৮ মার্চ আরেকটি কার্গো আসার কথা। এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, এলএনজি কিনতে দাম বেশি পড়ছে। একটি দ্বিগুণের কাছাকাছি, আরেকটি কার্গো দ্বিগুণের বেশি দামে কিনতে হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, স্পট মার্কেট থেকে কেনা দুই কার্গো এলএনজি গত মাসে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে। সেটি কিনতে এখন দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এতে সরকারকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গানভোর গ্রুপ থেকে একটি এলএনজি কার্গোর প্রতি ঘনফুট কিনতে খরচ হবে ২৮ দশমিক ২৮ ডলার। আর ভিটলের কাছ থেকে আরেকটি এলএনজি কার্গোর প্রতি ঘনফুট গ্যাসের জন্য ব্যয় হবে ২৩ দশমিক ০৮ ডলার। গানভোরের কার্গোর দাম প্রায় এক হাজার ২৭৯ কোটি টাকা হবে, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই ধরনের চালানের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ছিল।

জানা গেছে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট এড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দুটি কার্গো (জাহাজ) কিনেছে সরকার। বেশি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ে মন্ত্রিসভা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১০ শতাংশ সরবরাহ কমানো হয়েছে। অনেকে ডিজেল কিনে মজুত করছে। সংকটের শঙ্কায় মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। পেট্রল স্টেশনগুলো তেল মজুত করে রাখতে পারে। কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, গত চার দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার টন। গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৫৫ হাজার টন। বর্তমানে ১ লাখ ৮১ হাজার টন মজুত আছে ডিজেলের। তবে বিলম্ব হলেও ডিজেলের কয়েকটি জাহাজ এসে পৌঁছানোর কথা আগামী সপ্তাহে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১০ শতাংশ সরবরাহ কমানো হয়েছে। অনেকে ডিজেল কিনে মজুত করছে। সংকটের শঙ্কায় মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। পেট্রল স্টেশনগুলো তেল মজুত করে রাখতে পারে। কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, দেশে এখন জ্বালানির সংকট নেই। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগাম সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি দামে হলেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কেনা হচ্ছে। সবাইকে সাশ্রয়ী হতে অনুরোধ করা হয়েছে। বেসরকারি খাতকেও এলপিজি আমদানিতে সহায়তা করা হচ্ছে।

এদিকে গ্যাস সংকটের দুশ্চিন্তা থেকে সরবরাহ দিনে ২০ কোটি ঘনফুট কমানো হয়েছে। তবে গত বুধবার খোলাবাজার থেকে দুই কার্গো এলএনজি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিট সাড়ে ২৪ ডলার করে নিচ্ছে, যা ২০ মার্চ সরবরাহ করার কথা। আর গানভর দেবে প্রতি ইউনিট ২৮ ডলার করে, তাদের কার্গো ১৭ মার্চ আসার কথা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে এটি কেনা হচ্ছিল ১০ ডলার করে।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম বিশ্ববাজারে প্রতিদিন বাড়ছে। চীন, জাপান, ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি কিনতে প্রতিযোগিতা করছে। এর মধ্যেই কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

এদিকে বাজারে আবার এলপিজির সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে এলপিজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় জানুয়ারিতে ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছিল। রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজির সিলিন্ডার এক হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। এরপর বেসরকারি কোম্পানির বাড়তি এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। এতে বাজারে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলপিজি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা। বৃহস্পতিবার এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের সমস্যার কথা জানালে তা সমাধানের আশ্বাস দেন জ্বালানিমন্ত্রী। ব্যবসায়ীদের মন্ত্রী বলেছেন এলপিজির যাতে সংকট না হয়, সে ব্যবস্থা করার জন্য। আর বাজারে যাতে বেশি দামে বিক্রি করা না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে।

তিন খাতে সাশ্রয়ের নির্দেশনা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়ে বৃহস্পতিবার বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গ্যাস খাতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাসের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পরিহার করতে হবে। গ্যাস পাইপলাইন ও বার্নার নিয়মিত পরীক্ষা করে অপচয় রোধ করা দরকার। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।

জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং সম্ভব হলে শেয়ারিং ব্যবস্থা অবলম্বনে উৎসাহী করা। জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত যথাসম্ভব সীমিত বা পরিহার করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক খাতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সব সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে অফিস চলাকালীন এবং অফিস পরবর্তী সময়ে জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অতিরিক্ত জ্বালানির ব্যবহার পরিহার করতে হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা, আলোকসজ্জা পরিহার, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এয়ারকন্ডিশনার) তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখাসহ ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, করপোরেশনসহ সব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।