হাম আক্রান্ত হয়ে ও লক্ষণ নিয়ে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, এদের মধ্যে হাম আক্রান্ত হয়ে একজন এবং এ রোগের লক্ষণ নিয়ে বাকি ছয়জন মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। আর লক্ষণ নিয়ে ১৪৩ জন মারা গেছেন।
হামে মৃত্যুর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ জন ঢাকায়, ৫ জন বরিশালে এবং ৩ জন করে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে এবং দুইজন ময়মনসিংহের হাসপাতালগুলোতে মারা গেছেন। অপরদিকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। ঢাকায় এ সংখ্যা ৫৮ জন।
সবশেষ বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৪২ জন হাম আক্রান্ত হয়েছেন; যা এক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড। এসময়ে ১ হাজার ১৮৭ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন, যাদের মধ্যে ৬৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে একদিনে সবচেয়ে বেশি ২৬১ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এবং সবচেয়ে কম ১২৬ জন ভর্তি হয়েছেন ময়মনসিংহে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ২৫১ জন। এদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫ হাজার ৮০১ জন।
রাজশাহী ব্যুরো জানায় : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো চারটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় বিভিন্ন সময় তারা মারা যায়। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৫০ জনে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগী আরো বেড়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ২৭ জন। একই সময় সুস্থ্য হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ২৪ জন। আর মারা গেছে চারজন। তিনি আরো জানান, বর্তমানে হামের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৩২ জন। এদের মধ্যে আইসিইউতে রয়েছে ১২ জন। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৭৯। যাদের মধ্যে মারা গেছে ৫০ জন।
খুলনা ব্যুরো জানায় : ঝিনাইদহ থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় খুলনায় আনা হয়েছিল ১০ মাসের শিশু শামীমকে। তবে সেই আশা আর পূরণ হলো না। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসক ও সেবিকার অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা। মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) শামীমকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন বুধবার (৯ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত শামীম ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বালিপাড়া বেলদাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আরিফের ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে শামীমকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে খুলনায় পাঠানো হয়।
শামীমের স্বজনদের অভিযোগ, খুলনা মেডিকেলে ভর্তির পর চিকিৎসায় ছিল চরম অবহেলা। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও সেবিকারা সময়মতো শিশুটির খোঁজ নেননি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও ঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, এ অবহেলার কারণেই শামীমের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতালে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অপরদিকে খুলনা বিভাগে হাম আক্রান্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৩৬২ জনে। এর মধ্যে পূর্বের (পুরাতন) রোগী ২৮৮ জন এবং নতুন শনাক্ত হয়েছে ৭৪ জন। এ সময়ে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের ৮ এপ্রিল তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এসব রোগী শনাক্ত হয়েছে।
খুলনা জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যশোর জেলায় সর্বোচ্চ ৭৬টি মামলা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে নতুন ৩টি। কুষ্টিয়ায় মোট ৮৮ জন (নতুন ২৫), মাগুরায় ৪৫ জন (নতুন ১০) এবং বাগেরহাটে ২১ জন (নতুন ১৭) রোগী পাওয়া গেছে। এছাড়া, খুলনা জেলায় ৪টি, কেসিসিতে (খুলনা সিটি কর্পোরেশন) ৬৮টি, চুয়াডাঙ্গায় ৮টি, ঝিনাইদহে ৬টি, মেহেরপুরে ১২টি, নড়াইলে ২১টি এবং সাতক্ষীরায় ১৩টি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। তাই দ্রুত শনাক্তকরণ, টিকাদান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। তারা অভিভাবকদের শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বর, ফুসকুড়ি বা সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
সিলেট ব্যুরো জানায় : সিলেট হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশু আরিশার বয়স পাঁচ মাস ২১ দিন। আরিশা সুনামগঞ্জের ছাতকের গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা।
সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, শিশু আরিশা নিউমোনিয়া ও জ্বর নিয়ে ৬ এপ্রিল নগরীর শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে ভর্তি হয়। বুধবার তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওসমানীর আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই রাতে তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সিলেটে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো দুইজনে। এরআগে গত ৬ এপ্রিল সিলেটে হাম আক্রান্ত দুই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ওই শিশু।
এদিকে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নতুন করে ২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বিভাগে মোট ৩৯ জনের ল্যাব কনফার্ম কেস পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৬ জন সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ১৪ জন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।