আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ১৬ বছরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধকে যারা বৈধতা দিয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, শুধু জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলো নয়, গত ১৬ বছরে এসব অপরাধের পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছেন বা সেগুলোকে বৈধতা দিয়েছেন, তাদেরও চিহ্নিত করে যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চ ২৪ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অনৈক্য ও বাংলাদেশের ক্ষতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন- দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশেদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও লেখক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ের সময় যারা অস্ত্র ও লাঠিসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় নেমেছিল, তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করে প্রোফাইল তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গত ১৬ বছরে যারা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের বৈধতা দিয়েছে, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে দেশে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক এই প্রেস সচিব বলেন, জুলাইকে ঘিরে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটি বাস্তবায়ন হবে। অনেকে ভাবছেন, জুলাইয়ের ঐক্য কিছুটা হলেও ভেঙে গেছে। আমি মনে করি না, জুলাইয়ের ঐক্য ভেঙেছে। জুলাইকে ঘিরে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আমি মনে করি প্রত্যেকটাই বাস্তবায়ন হবে। আজকে হচ্ছে না, কিন্তু কালকে হবে। এটা হতেই হবে এবং আমি নিশ্চিত, এটা হবে।

জুলাইয়ের আন্দোলনকে ‘জনযুদ্ধ’ ও ‘মহৎ বিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, মানুষ রাস্তায় নেমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এর চেয়ে মহৎ বিপ্লব আর হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, এটা বিপ্লব ছিল। আমি জুলাইকে বিপ্লব বলছি। কারণ, জুলাই বাংলাদেশকে খোলনলচে পাল্টে ফেলার একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষার জন্য সবাই রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ নেমেছিল। বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা বা শহর ছিল না, যেখানে মানুষ নামেনি।

জুলাইয়ের অনেক সংস্কার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, এ ক্ষেত্রে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো জুলাইয়ের সময়ের সব ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা। আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী অস্ত্র ও লাঠিসহ আন্দোলনে নেমে সাধারণ মানুষকে হত্যার চেষ্টা করেছেন, তাদের প্রত্যেককে শনাক্ত করে প্রোফাইল তৈরি করা প্রয়োজন।

এ জন্য আলাদা একটি সংস্থা বা এনফোর্সিং এজেন্সি গঠনের দাবি জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, আপনারা অনেকে ভাবছেন, এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করুক। তবে আমাদের সবার মিলে দাবি করা উচিত, এ জন্য একটি আলাদা সংস্থা করা হোক। আলাদা এনফোর্সিং এজেন্সি হোক। এই লোকগুলোকে ট্র্যাক ডাউন করা, আইডেন্টিফাই করা এবং প্রত্যেকের প্রোফাইল তৈরি করা হোক।

জুলাইয়ের সময় কে কোথায় ছিলেন এবং কোন জেলা থেকে আন্দোলনে নেমেছিলেন, এসব তথ্যও নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশেদ বলেছেন, ফ্যাসিবাদী কোনো ব্যক্তি বা দল সরে গেলেই ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় না । তিনি বলেছেন, ফ্যাসিবাদ বিভিন্নভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিরে আসতে পারে। তাই শুধু একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পরাজয় নয়, ফ্যাসিবাদের জন্ম ও বিকাশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিক কারণগুলোও বিশ্লেষণ করতে হবে।

তাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই । তিনি বলেন, যারা ট্যাংক, এপিসি ও হেলিকপ্টারের সামনে দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন, তারা যখন দেখবেন তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কার হচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সেই ক্ষোভ বাড়তে থাকলে রাষ্ট্রে আবারও আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সরকার অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার দ্রুত কোনো কাজ করতে পারছে না এবং সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান বা মোকাবিলা করতে পারছে না। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সংসদে যারা গেছেন, তারা জুলাইয়ের মতো একটি মহাবিপ্লব কোন প্রেক্ষাপটে ও কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।