দায়িত্ব গ্রহণের সোয়া তিনবছরের মাথায় পদত্যাগ করলেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরকৃত পদত্যাগপত্র নিয়ে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এএসএম বাহাউদ্দিন শুক্রবার বিকাল ৫টা ০১ মিনিটে জাতীয় সংসদে আসেন। পরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মাধ্যমে বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিলো পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে হাসিনার পছন্দে মনোনীত প্রার্থী হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগত্রে যা লিখেছেন সাহাবুদ্দিন:
আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রি. সনের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ৫ই আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্রÑজনতার গণÑঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।
নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝেমধ্যে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফেরার পর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সংসদ ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে আসেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেলে তাঁর কাছে পদত্যাগপত্রটি এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী এখন তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়েছেন জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র বিকেল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। রাষ্ট্রপতি লিখিতভাবে তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি অসুস্থতার যে কারণগুলো দেখিয়েছেন, তা তুলে ধরে স্পিকার বলেন, রাষ্ট্রপতি হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন। এর আগে তাঁর হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সংবিধানে কী আছে:
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
স্পিকারের দায়িত্বে কায়সার কামাল:
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এর পাশাপাশি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে হাফিজ উদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্পিকারের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জানানো হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। যেদিন আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি, সেদিনই প্রয়োজন হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের জন্যও শপথ নিয়েছি। একইভাবে ডেপুটি স্পিকার শপথ নেয়ার সময়ও শপথের অংশ হিসেবে উল্লেখ থাকে কোনো কারণে স্পিকারের পদ শূন্য হলে তিনি স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন।’
স্পিকার বলেন, ‘আমরা আশা করি, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল, তা পরিষ্কার হয়েছে। এ নিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, বিরূপ মনোভাব বা বিভ্রান্তি তৈরি হবে না। এর আগেও বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন। তবে রাষ্ট্রপতির পদ কখনোই শূন্য থাকে না; সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা থাকে।
গুলশান বাসভবনে উঠবেন সাহাবুদ্দিন:
পদত্যাগের পর নিয়ম অনুযায়ী এখন মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ‘বঙ্গভবন’ ছাড়তে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব ছাড়ার পর রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত নিজের ব্যক্তিগত বাসভবনে উঠবেন সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এ ছাড়াও চিকিৎসার জন্য তার বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।
এদিকে বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, পদত্যাগপত্র হস্তান্তরের পর মো. সাহাবুদ্দিন আর রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে নেই। পদত্যাগের আগে তিনি বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রপতি মনোনীত কয়েকজন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত মালামাল গুছিয়ে নিয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, কয়েক দিন আগে রাষ্ট্রপতি অধস্তন কর্মকর্তাদের চলতি মাসের মধ্যেই বঙ্গভবন ছাড়ার মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন। পদত্যাগের পর তিনি গুলশানের নিজ বাসায় অবস্থান করবেন এবং পরে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালনকারী আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার দুদিন আগে জানিয়েছেন যে, ওরা আমাকে (রাষ্ট্রপতি) চলে যেতে বলেছে। হয়তো আমাকে চলে যেতে হবে। তোমরা চলতি মাসের মধ্যেই বঙ্গভবন ছেড়ে যার যার মতো করে চলে যাও।’ ‘ওরা’ বলতে কাকে বুঝিয়েছেন-এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
পেছনের খবর:
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল মো. সাহাবুদ্দিন পাঁচ বছরের জন্য দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের জোর দাবি উঠে। তাকে অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরামর্শে রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়নি অন্তবর্তী সরকার। তবে রাষ্ট্রপতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে ছিলেন।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের আলোচনা ফের শুরু হলেও বিএনপি’র নেতৃত্ব দেখে শুনে ব্যবস্থা নেয়ার পথে হাঁটে। দেড় বছর মেয়াদ থাকায় রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনে তাড়াহুড়ো ছিল না এতোদিন। কিন্তু সাহাবুদ্দিন নিজেই পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন। গত মে মাসে লন্ডন সফরের সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে এমন তথ্য সামনে এসেছে।
গত ৯ থেকে ১৮ই মে সাহাবুদ্দিন চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফর করেন। এসময় তিনি দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। অনেকে বলছেন, অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার এই যোগাযোগ সরাসরি শপথ ভঙ্গের মধ্যে পড়ে। এছাড়া তার এই যোগাযোগ প্রমাণ করে তিনি ফ্যাসিস্টদের পক্ষে এখনও কাজ করছেন। এ কারণে তাকে এই পদে রাখার আর সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনার সঙ্গে সাহাবুদ্দিনের যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পরই সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে বিশেষ বার্তা দেয়া হয়। তাকে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। জুলাই মাসের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরকারি ইচ্ছার বিষয়টিও তাকে অবহিত করা হয়। তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেয়।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা চক্রান্ত হয়েছে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে। আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।’ ওই দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথাও ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপ্রধান।
সাহাবুদ্দিনের পরিচয়:
তথ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা শহরের শিবরামপুরের জুবিলি ট্যাংক পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শরফুদ্দিন আনসারী, মায়ের নাম খায়রুন্নেসা। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৯-৭০ সালে অবিভক্ত পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং ১৯৭০-৭৩ সালে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাবনা টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন ছিলেন অন্যতম। তিনি পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহাবুদ্দিন ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তিনি ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে যোগ দেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাহাবুদ্দিনের স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে ২০০৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মো. আরশাদ আদনান তাদের একমাত্র সন্তান। তার দুই যমজ নাতি তাহসিন মো. আদনান ও তাহমিদ মো. আদনান। ভ্রমণ, বই পড়া ও গান শোনা রাষ্ট্রপতির প্রিয় শখ।