বক্তব্যে মুগ্ধতা, নির্যাতনের বর্ণনা, ফাঁিসর মঞ্চ থেকে সংসদে আসা, প্রাণবন্ত বির্তক, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ ও ওয়াক আউটসহ নানা ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়েছে সংসদ। দীর্ঘ ১৮ বছর পর ‘প্রাণবন্ত সংসদ’ হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এ অধিবেশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল প্রাণবন্ত বির্তক, উত্তেজনা। পক্ষে বিপক্ষে বক্তব্য। একে অপরকে আক্রমণ, প্রতিবাদ-পাল্টা প্রতিবাদ। বক্তব্যে মুগ্ধতাও ছড়িয়েছেন অনেকে। সেই সাথে নানা বিষয় নিয়ে বিরোধী দলের ওয়াক আউট। সবমিলিয়ে জনগণের আশা আকাক্সক্ষা পূরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সংসদ। অধিবেশনের প্রতিটি বৈঠকই জনগণের নজর কেড়েছে। জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা পালনে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়নি বিরোধী দল। সরকারী দলও বিরোধী দলের যৌক্তিক সমালোচনাকে আমলে নিয়েছেন। পদক্ষেপ নিয়েছেন। যার ফলে জ্বালানী সংকটের মতো সবচেয়ে বড় সংকটের সমাধান হয়েছে দ্রুত সময়ে। অবশেষে সরকারি ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
অধিবেশন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সংসদে মোট ২২০ জন সদস্য প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। ১২ই মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়। এবারের অধিবেশনে মোট বৈঠক দিবস ছিল ২৫টি। অধ্যাদেশ ছিল ১৩৩টি। অধ্যাদেশগুলোর বিপরীতে ৯১টি বিলসহ মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। ৫টি স্থায়ী কমিটি এবং ২টি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে। ৬২ বিধিতে ১৬টি নোটিশের মধ্যে ২টির উপর আলোচনা হয়েছে। ৬৮ বিধিতে ৯টি নোটিশের মধ্যে ১টির উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। ৭১ বিধিতে গৃহীত ৩৮টি নোটিশের উপর আলোচনা হয়েছে। ৭১ (ক) বিধিতে ২০৭ বার বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরদানের জন্য ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে তিনি ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য মোট ২৫০৯টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে মন্ত্রীগণ মোট ১৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেছেন।
সংসদ অধিবেশন দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন স্পীকার মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। অধিবেশন মূল্যায়ণ করে স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এই মহান সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। তাই এই অধিবেশন ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমার বেশ কয়েকটি সংসদ দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছেÑ এই ত্রয়োদশ সংসদে এই অধিবেশনে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং সহযোগিতা আমি দেখতে পেয়েছি, অতীতের কোনো সংসদে এ ধরনের দৃশ্য দেখতে পাইনি। সংসদে একটি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছি যেখানে অংশগ্রহণকারী সকল মাননীয় সংসদ সদস্য সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। সামনে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। মতের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেয়ার জন্য তিনি সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সংসদ সদস্যরা তাদের বক্তব্যে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। পরষ্পরের প্রতি সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন তাদের বক্তব্যে। জনগণের সমস্যা সমাধানে এলাকার উন্নয়নের প্রতি জোর দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে বিরোধী দলের সদস্যদের পাশাপাশি সরকারী দলের অনেক সদস্যও ধন্যবাদ জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। এতে করে সংসদ সদস্যদের নিজস্ব স্বাধীন মতামত প্রকাশের বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে গুটিকয়েক সংসদ সদস্য বিরোধী দলকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়ে বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। তাদের অধিকাংশই বিগত সরকারের সময় জুলুম নির্যাতনের শিকার হনননি। কেউ কেউ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আর কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে সমঝোতা করে নানা ধরনের সুবিধা নিয়েছেন। তবে যারা বিগত সরকারের সময় হামলা মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তারা সংসদে আক্রমণ করে কোন বক্তব্য দেননি। বরং মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। ঐক্যের পক্ষে কথা বলেছেন। আশংকা প্রকাশ করেছেন, নিজেদের মধ্যে অনৈক্যের ফলে ওরা যদি আবার চলে আসে তাহলে কারো জন্যই ভালো ফল বয়ে আনবে না।
গোটা অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন সরকারি দলের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, রুলস অব প্রসিডিউর অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির চেয়ারকে আমি সম্মান করি। সেই সম্মান রেখেই বলছি, আমি ওই চেয়ারকেÑঅর্থাৎ প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ দিচ্ছি; কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সাহেবকে আমি ধন্যবাদ জানাতে পারলাম না, এজন্য আমি দুঃখিত।
২৪ এর আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, সে সময় জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা ছিল সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া। এতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মীরা নয়, বরং রিকশাচালক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিল।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ সংসদের নেতৃত্বে একজন স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন। সেই সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নানা অপবাদ দেওয়া হতো। তারপরও আমরা সেই সংসদে ছিলাম। উনি টোকেন দিতেন যুব মহিলা লীগের নেত্রীদের, কিভাবে মন্দ বলা যায়? কিভাবে তারেক রহমান সম্পর্কে, কিভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে মন্দ বলা যায়? কথার সঙ্গে ‘জামায়াত-শিবির’ বা ‘জামায়াত-বিএনপি’ ট্যাগ জুড়ে দেওয়া হতো বলেও জানান তিনি।
সংসদকে আরও কার্যকর ও গণমুখী করার আহ্বান জানিয়ে আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, আর কত তর্ক-বিতর্ক, আর কত একে অপরকে ছোট করা? আসুন আমরা এই সংসদকে সবার সংসদ হিসেবে গড়ে তুলিÑযে সংসদ দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে। আমরা হয়তো একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করি, কিন্তু সাধারণ মানুষ ঠিকই বুঝতে পারে কার কথা সঠিক। আগামী দিনে যে চ্যালেঞ্জই আসুক, দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যদি সেই সাহস ও শক্তি থাকে, তবেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরিশেষে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জ্বালানী সমস্যা নিয়ে সরকারী ও বিরোধী দল কমিটি করার পর সংকট কমে এসেছে। দেশবাসী বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে এই বিষয়কে সরকারি দল এবং বিরোধী দল সিরিয়াসলি নিয়েছে।
তিনি বলেন, আসেন ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই। কিন্তু ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হলে আসলে মানসিকতায় আমাদের সবার পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তন বক্তব্যে নয়, পরিবর্তন আনতে হবে মানসিকতায়। সেটা কী? সেটা আর কিছুই নয়Ñ ‘খবঃ ঁং ধমৎবব ঃড় ফরংধমৎবব’। আমার ওপেনিয়ন আমি দেব, আপনার ওপেনিয়ন আপনি দেবেন। আমারটা আপনি শ্রদ্ধাভরে শুনবেন, আপনারটা আমি শ্রদ্ধাভরে শুনব। এরপরে যা যৌক্তিক তা নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাব।
বিরোধী দলের নেতার এ বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, আমরা এগ্রি করছি ডিজেগ্রিমেন্টের জন্য। এগ্রি টু ডিজেগ্রি পৃথিবীর তাবত দেশ যারা গণতন্ত্রের চর্চা করে, প্রত্যেকটি পার্লামেন্টেই এটি একটি স্বীকৃত বিষয়। কোনো বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি, কোনো কোনো বিষয়ে হয়তো আমাদের দ্বিমত আছে। পরিষ্কারভাবে আমার দলের অবস্থান থেকে আমি বলতে চাই যে, যেসকল বিষয়ে আমাদের দ্বিমত রয়েছে, আমরা বিরোধী দলের সদস্যদের সাথে বসব, আলোচনা করব, দেশের স্বার্থে আমরা সমাধান বের করব।
সবমিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ জনগণের সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সরকারী ও বিরোধী দল জনগনের সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলে তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।