আশরাফুর রহমান, তেহরান থেকে : ইসলামাবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার টানা আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। এটি ছিল ১৯৭৯ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর ৪৭ বছরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠক। আলোচনা ভেংগে যাওয়ায় চলমান যুদ্ধবিরতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতি আবারও চাপে পড়ছে।

বহু প্রতিক্ষিত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেয়নি, অন্যদিকে কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে আলোচনার ব্যর্থতার গভীরতা স্পষ্ট।

‘অসম্ভব’ শর্তেই অচলাবস্থা

ইসলামাবাদে এই ব্যর্থতার পেছনে ছিল এমন কিছু দাবি, যেগুলোকে ইরানি কর্মকর্তারা এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা ‘অসম্ভব’ বলে অভিহিত করেছেন।

ওয়াশিংটন শুধু হরমুজ প্রণালীতে তাদের ও মিত্রদের জাহাজ চলাচলের অবাধ অধিকারই নয়, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা, বিদ্যমান ইউরেনিয়াম মজুদ হস্তান্তর এবং লেবানন ইস্যুটি ইসরাইলের হাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানায়। তেহরানের কাছে এসব শর্ত ছিল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শামিল। ফলে তেহরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। যদিও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এগুলোকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ হিসেবে দাবি করেন।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, আলোচনার আগেই তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ইরানের ‘প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ও ইচ্ছাশক্তি’ রয়েছে, কিন্তু ‘পূর্ববর্তী দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই।

কালিবাফ দাবি করেন, ইরানি প্রতিনিধিদল ‘অগ্রগামী উদ্যোগ’ উপস্থাপন করলেও বিপক্ষ দল আলোচনার এই পর্বে ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, “আমেরিকা আমাদের যুক্তি ও নীতিমালা বুঝতে পেরেছে এবং এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে তারা আমাদের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না।”

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে তারা ‘হতাশ’। তিনি জানান, বৈঠকের সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোন ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনার ফোকাস বদলে দেয়।

আরাকচি লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধক্ষেত্রে যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে আদায়ের চেষ্টা করেছে।”

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। বিশ্ব অর্থনীতি আবারও সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কায় দুলছে যার জন্য দায়ী ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত।

তেলের বাজারে অস্থিরতা, বাড়ছে মূল্যস্ফীতি

আলোচনা ভেঙে পড়ার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে। ৯ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের ওপরে উঠেছিল, আর পেট্রোলের দাম ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

যুদ্ধবিরতির পর দাম কিছুটা কমে ৯৫ ডলারের কাছাকাছি এলেও তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। সোমবার থেকে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের মার্কিন ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) গত বছরের তুলনায় ৩.৩% বেড়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যমের মতে, সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও এখন ফেডারেল রিজার্ভ একটি কঠিন অবস্থায় পড়েছে। সুদের হার বাড়ালেও জ্বালানির দাম কমবে না, আবার কিছু না করলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ১৯৭০-এর দশকের ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন।

এমনকি এক্সনমোবিল ও শেভরনের মতো মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোও এখন অনিশ্চয়তার মুখে, যদিও যুদ্ধের সময় তাদের শেয়ার বেড়েছিল।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা—তেলের দাম যদি ১৪০ ডলার ছুঁয়ে সেখানে স্থায়ী হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে পড়বে।

ইউরোপে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা

ইউরোপের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে জেট ফুয়েল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। ইউরোপ তার জেট ফুয়েলের ৪০-৫০% হরমুজ প্রণালি থেকে আমদানি করে, কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সেখান থেকে কোনো বড় চালান আসেনি।

এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপ সতর্ক করেছে, তিন সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জেট ফুয়েলের তীব্র সংকট দেখা দেবে।

ইতোমধ্যে জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণ হয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইতালির বিমানবন্দরগুলো জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করছে, আর এয়ারলাইনগুলো ফ্লাইট কমাচ্ছে, অতিরিক্ত চার্জ নিচ্ছে এবং ভাড়া বাড়াচ্ছে।

ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকও একই সমস্যায় পড়েছে। ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার প্রধান কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি।

জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ড নিয়ে গঠিত ডিএসিএইচ অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে, যদিও সুদের হার কমানোর চাপ বাড়ছে।

এই যুদ্ধ শুধু জ্বালানি সংকটই নয়, যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোট ব্যবস্থার ভাঙনও প্রকাশ করেছে।

জোট রাজনীতিতে ফাটল

এই সংকট শুধু অর্থনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। স্পেন ও ইতালি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্য ন্যাটো মিত্ররাও এই যুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়া। পারস্য উপসাগরীয় মিত্ররাও যুদ্ধে অংশ নেয়নি, ফলে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা একাই ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষায় এগোচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব কমে যাওয়ারও ইঙ্গিত।

ডলারের আধিপত্যেও চ্যালেঞ্জ

নতুন করে আলোচনায় এসেছে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়টি। ইরান প্রস্তাব দিয়েছে, হরমুজ দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করতে হলে জাহাজগুলোকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ফি দিতে হবে, যা ডলারনির্ভর ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে যায়।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, কিছু জাহাজ ইতোমধ্যে নিরাপদ চলাচলের জন্য ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করেছে। ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ ডলার সমপরিমাণ টোল দাবি করছে, যা ডিজিটাল মুদ্রায় দিতে হবে।

অন্যান্য দেশগুলোও যদি এই পথ অনুসরণ করে, তাহলে পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ জ্বালানি মূল্য, অস্থির বাজার এবং অনিশ্চয়তা।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রভাব

ইরান-মার্কিন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ফের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। অবরোধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোন জাহাজ যাবে আর কোনটি যাবে না, তা ইরান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তিনি ঘোষণা দেন, হয় সব জাহাজ সেখানে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ পাবে, নয়তো একটিও পাবে না।

অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রণালীতে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। আইআরজিসি’র বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, “যেকোনো অজুহাত বা পরিচয়ে হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া সামরিক জাহাজের কার্যক্রম যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘যদি মার্কিন সরকার তাদের কর্তৃত্ববাদী অবস্থান ত্যাগ করে এবং ইরানি জাতির অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, তাহলে অবশ্যই সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।’

ইরানের তাসনিম নিউজে বলা হয়েছে: “যুক্তরাষ্ট্র যুক্তিসঙ্গত চুক্তিতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে কিছুই পরিবর্তন হবে না।”

পতনের দ্বারপ্রান্তে মার্কিন সাম্রাজ্য

বিশ্লেষকদের মতে,২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের নকশা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের। আর ইসলামাবাদে আলোচনা ভেঙে পড়ার ফলে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন তাদের সামনে বড় বাস্তবতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংকট আরও গভীর হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে। শুধু তাই নয়, আবার যুদ্ধ শুরু হলে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের কবর রচিত হবে। মার্কিন অধ্যাপক জেফ্রি সাক্স বলেছেন, ‘ট্রাম্প যদি এখনই ইরান থেকে বের না হন তাহলে আমার জীবনকালেই আমেরিকার সাম্রাজ্যের পতন আমরা দেখতে পাব।’

লেখক: ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থায় (আইআরআইবি) কর্মরত সাংবাদিক ও কলামিস্ট