৫ বছরের মধ্যে এলপি গ্যাসের দামে বড় লাফ
এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জিরেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একইসঙ্গে অটোগ্যাস ৬১.৮৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৯.৭৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৫ বছরের মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম এবারই প্রথম একসাথে এত টাকা বাড়ানো হয়েছে ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিইআরসির কনফারেন্স রুমে সংবাদ সম্মেলনে নতুন দর ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসির সদস্য ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শাহিদ সারওয়ার।
বিইআরসি ঘোষিত নতুন দামে বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যও সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫.৫ কেজির সিলিন্ডার ৭৯২ টাকা, ১২.৫ কেজি ১ হাজার ৮০১ টাকা, ১৫ কেজি ২ হাজার ১৬১ টাকা, ১৬ কেজি ২ হাজার ৩০৫ টাকা, ১৮ কেজি ২ হাজার ৫৯৩ টাকা এবং ২০ কেজি ২ হাজার ৮৮১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ২২ কেজি সিলিন্ডার ৩ হাজার ১৬৯ টাকা, ২৫ কেজি ৩ হাজার ৬০১ টাকা, ৩০ কেজি ৪ হাজার ৩২১ টাকা, ৩৩ কেজি ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা, ৩৫ কেজি ৫ হাজার ৪১ টাকা এবং ৪৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৪২৮ টাকা।
যদিও গত ৫ মাস ধরে বিইআরসি ঘোষিত দরের কোনো কার্যকারিতা নেই। বলা যায়, নজিরবিহীন অরাজকতা চলছে এলপিজি খাতে। বিক্রেতারা ইচ্ছে মাফিক দাম আদায় করছে। মার্চের দর ১৩৪১ টাকা থাকলেও ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায় বেচাকেনা করে যাচ্ছে।
বিইআরসি বলছে, বাজারে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে।
সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। অভিযোগ আছে, প্রতি সিলিন্ডারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা।
জানা গেছে, সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।
এলপি গ্যাস সংকটকে পুঁজি করে একের পর এক সুবিধা দেওয়া হয় আমদানিকারকদের। আমদানিসীমা বাড়িয়ে দেওয়া, ট্যাক্স কমানো এবং এলসিতে ঋণ সুবিধার ধারাবাহিকতায় ফ্রেইটচার্জও (জাহাজ ভাড়া) টন প্রতি ১০৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২১ ডলার করা হয়েছে। শুধু এসব সুবিধা নয়, আমদানিকারকদের দাবির প্রেক্ষিতে ঋণে এলসি খোলার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে গত ১২ জানুয়ারি জারিকরা আদেশে ২৭০ দিন পর্যন্ত বাকিতে এলপিজি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সংকটের কথা বলে ৫টি কোম্পানি তাদের আমদানির ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। যুমনা স্পেসটেক এলপি গ্যাসের ১ লাখ ৮০ হাজার টন আমদানির ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার টন করা হয়েছে। একইভাবে ডেল্টা এলপিজির ২০ হাজার টন বাড়িয়ে ৮০ হাজার টন, ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের বার্ষিক আমদানির ক্ষমতা ৩ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টন, মেঘনা এলপিজির ২ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন, ইউনাইটেড গ্রুপের আইগ্যাসকে ১ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এত কিছুর পরও বাগে আনা যাচ্ছে না এলপি গ্যাসের দাম। প্রকাশ্যে বেশি দামে বিক্রি করা হলেও ভোক্তা অধিদফতর হাতগুটিয়ে বসে রয়েছে। চলছে দায় চাপানোর খেলা।
২০২১ সালের ১২ এপ্রিলে প্রথমবারের মতো এলপি গ্যাসের দর ঘোষণা করা হয়। তখন বলা হয়েছিল এখন থেকে সৌদির দর ওঠা-নামা করলে ভিত্তিমূল্য ওঠা-নামা করবে। অন্যান্য কমিশন, জাহাজ ভাড়া, আমদানিকারকের কমিশন, ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন কমবেশি করতে হলে নতুন করে গণশুনানি করা হবে। ওই ঘোষণার পর থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দর ঘোষণা করে আসছে বিইআরসি।
ক্রেতাদের মরার ওপর খাড়ার ঘা
এদিকে আমাদের খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনায় একলাফে এলপি গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই বাজারে বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। ফলে বিপাকে পড়েছে সাধারণ ক্রেতারা। বর্তমানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারিত থাকলেও খুচরা পর্যায়ে তা ১ হাজার ৯০০ টাকা টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ এনার্জী রেগুলেটরী কমিশনের ঘোষণা ছাড়াই সকল প্রাইভেট গ্যাস কোম্পানী এলপি গ্যাসের মূল্য ৪০০ টাকা বৃদ্ধি করায় ক্ষোভ জানিয়েছে ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা।
খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির বিভিন্ন কোম্পানীর এলপি গ্যাস ১৮৫০ টাকা থেকে ১৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা একদিন আগেও ১৪৫০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। হাঠৎ করেই একলাফে সিলিন্ডার প্রতি ৪০০ টাকা গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও ১৯৫০-২০০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই পূর্বের দামে গ্যাস কেনা থাকলেও সেগুলো মজুদ করে নানা অযুহাত দেখিয়ে গ্যান নেই জানিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন গ্যাসের দাম নির্ধারণ হলে বিক্রি করবেন।
নগরীর খালিশপুরের বাসিন্দা সোহাগ আসিফ বলেন, কয়েকদিন আগেও এলপি গ্যাস ১ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বুধবার অনেক দোকানে গ্যাস বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। বলছে দাম নির্ধারণ হলে বিক্রি করবে। কিছু দোকানে ৪০০-৪৫০ টাকা বেশি দাম চাচ্ছে। হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছে। তবে সরকারের কোনো ঘোষণা ছাড়াই দাম বাড়ানো কতোটুকু যুক্তিযুক্ত ভাবার বিষয়। মনিটরিংয়ের প্রয়োজন।
নগরীর মিস্ত্রিপাড়া এলাকার জুয়েল টেডার্সের মালিক নুর আলম জানান, গত ৩-৪ দিন ধরে কোনো কোম্পানী থেকে গ্যাস পাচ্ছি না। আগের যা আছে তাই দিয়ে চলছি। আগামীকাল কোম্পানী থেকে গ্যাসের দর নির্ধারণ করবে এবং পাওয়া যাবে। অথচ তার দোকানে গ্যাস ভরা এমন অনেক বোতল দেখতে পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসা করলে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। খুলনা কমার্স কলেজ মোড়ের আছাদ স্টোরের এলপি গ্যাস বিক্রেতা হাসিব বলেন, হঠাৎ করে কোম্পানী থেকে বাড়তি দামে এলপি গ্যাস কিনতে হচ্ছে। ওমেরা গ্যাস ১ হাজার ৮৫০ টাকা করে কিনেছি। আর সেনা ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কিনেছি। হঠাৎ কোম্পানী দাম বাড়ানোই কেনা দামেই বিক্রি করছি। কারণ গ্রাহকরা দাম বাড়ার এই ধাক্কা সামলাতে হিমসিম খাবে। দাম বাড়ার পেছনে আমাদের করণীয় কিছু নেই।
নগরীর দোলখোলা মোড়ের বিক্রেতা আনিস বলেন, গ্যাস ও সিলিন্ডার সংকট থাকায় দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। তাছাড়া চাহিদা অনুযায়ি কোম্পানী কোনো গ্যাস দিচ্ছে না। যমুনা গ্যাস কোম্পানী থেকে ১ হজার ৮৭৫ টাকায় কিনে ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ দরে বিক্রি করতে না পারলে দোকান চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। গত ৩০ মার্চ থেকে সকল প্রকারের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করেছে কোম্পানী।
এদিকে দাম বৃদ্ধির জন্য প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা। বুধবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এনার্জী রেগুলেটরী কমিশনের ঘোষণা ব্যতীত দেশের সকল প্রাইভেট গ্যাস কোম্পানী গ্যাসের মূল্য ৪০০ টাকা বৃদ্ধি করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিশ্ব বাজার ও যুদ্ধের অযুহাতে একসঙ্গে প্রতি সিলিন্ডার গ্যাসে ৪০০ টাকা বৃদ্ধি করায় এ যেন ‘মরার পরে খাড়ার ঘা’। এতে করে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে চলে যাবে আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় ধ্বস নামবে। সরকারের ভ্যাট, ট্যাক্স প্রদান কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। অনতি বিলম্ভে গ্যাসের মূল্য পুনঃনির্ধারণ করার জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তারা। বিবৃতিদাতারা হলেন, খুলনা এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শেখ মো. তোবারেক হোসেন তপু , সাধারণ সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহ-সভাপতি মোশাররফ হোসেন, মো. হানিফ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওদুদ মিয়া।