৭৫ সচিবের মধ্যে ২০ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে অনেক মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছে। ১৮ বছরে প্রশাসনসহ সব সার্ভিসে দলীয় ট্যাগের কারণে এসব মেধাবী, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চনাসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। বঞ্চিত এসব কর্মকর্তার বিএনপি সরকার যথাযথ মুল্যায়ন শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রশাসনের বঞ্চিতদের মুল্যায়ন কাজ শুরু করে তারই ধারাবহিকতায় বর্তমান সরকার প্রশাসনের শীর্ষ পদে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিতদের দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো শুরু করেছে।
এরই অংশ হিসেবে বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৭৫ সচিবের মধ্যে ২০ জনকে চুক্তিতে নিয়োগ দেয় হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক এই সচিবরা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বঞ্চিত’ হিসেবে পরিচিত। এদের ১৩ জনকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিয়োগ দেয়। বাকী ৭ জন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন।
নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে তিনজন সিনিয়র সচিব কর্মরত রয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। এই তিন শীর্ষ পদ ছাড়াও আরও ১৭ জন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে বিভিন্ন বিভাগের দপ্তর-অধিদপ্তরে আরও বেশ কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব পদমর্যাদায় কর্মরত রয়েছেন।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন যারা
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। ১ মার্চ চুক্তিতে ধর্ম সচিব নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনিও এক বছরের জন্য চুক্তিতে এ নিয়োগ পান। ৩ মার্চ চুক্তিভিত্তিতে চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চারজন সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যে মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, রফিকুল আই মোহাম্মদকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, আবদুল খালেককে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এবং মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবাইকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিতে নিয়োগ পান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল। ২৫ মার্চ এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আরও কর্মরত রয়েছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ. এস. এম. সালেহ আহমেদ, বাংলাদেশের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. মো. নিয়ামত উল্লাহ ভূইয়া, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এবং ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এ. জে. এম. সালাহউদ্দিন নাগরীও চুক্তিতে কর্মরত রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী (সচিব পদমর্যাদা) ড. শাকিরুল ইসলাম। সবশেষ গত ১৮ এপ্রিল পৃথক প্রজ্ঞাপনে তিনজনকে সচিব পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জকরিয়া, সাফিজ উদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের ওয়াকফ প্রশাসক এবং মো. আব্দুল্লাহ আল বাকীকে ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়। এর মধ্যে ৮ জন সিনিয়র সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন।
জানা গেছে, জনপ্রশাসনের মৌলিক কাঠামোতে প্রকৃতপক্ষে ‘সিনিয়র সচিব’ নামের কোনো পদ নেই। সিনিয়র সচিব ও সচিবের কাজ একই। তবে, বেতন ও পেনশনসহ নানা ক্ষেত্রে সিনিয়র সচিব পদের আর্থিক সুবিধা বেশি। এজন্য মূলত পছন্দের আমলাদের খুশি করতে এ পদের সৃষ্টি করা হয় বলে সমালোচনা রয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর তিনদিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে ব্যাপক ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালায় ইউনুস সরকার। এই সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত সচিবদের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এছাড়া নিয়মিত সচিবদের মধ্য থেকেও কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং কাউকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। শূন্য হওয়া এসব পদে অনেককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর নতুন সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার চুক্তি বাতিল করেছেন। আবার বেশ কয়েকজন এখনো কর্মরত আছেন। এছাড়া বিএনপি সরকার নতুন করে আরও ১৪ জনকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন।
জানা গেছে, প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এতে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা সুযোগ পান। তবে অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তা সুযোগ পেলেও বঞ্চিত হন নিয়মিত চাকরিতে থাকা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা। ফলে একটা শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়। জনপ্রশাসনের বিশেষায়িত বা কারিগরি পদে কর্মকর্তা সংকটের কারণে গত শতকের আশির দশকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন হয়। কিন্তু পরে বিষয়টি প্রশাসন রাজনীতিকীকরণের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সরকারগুলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের চাকরিতে রেখে দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের রোগ সবচেয়ে বেশি ছিল বলে জানান প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খুবই সীমিত পরিসরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছে। বিগত ১৮ বছরে প্রশাসনসহ সব সার্ভিসে যেসব মেধাবী, দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চনাসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো হবে। তবে সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের চর্চা বেশিদিন করবে না। মেধাভিত্তিক গতিশীল প্রশাসন গড়ে তোলার প্রশ্নে সরকারের মেয়াদে সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের লাগাম টেনে ধরা হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারকে কিছু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতেই হবে। কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অসংখ্য মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে দফায় দফায় পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুযোগ থাকলেও এসব কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এমন কর্মকর্তার সংখ্যাও কম নয়। ফলে কাক্ষিত মেধাভিত্তিক দক্ষ প্রশাসন করতে চাইলে আমাদের কিছু সিনিয়র স্যারদের কাজের সুযোগ দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন,নতুন একটি সরকারকে চুক্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া লাগবে। এ কারণে তাদের চুক্তি দিতে হবে যে, অনেক কর্মকর্তা বিএনপির অপবাদ নিয়ে গত ১৫/১৬ বছর অনেক কষ্ট করেছেন। যেহেতু বিএনপির তকমা তাদের গায়ে লেগেছে, তাই বিএনপি তো তাদের একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না।
তার ভাষ্য , সবাইকে তো চুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, অল্পসল্প কিছু কর্মকর্তাকে দেওয়া, যারা যোগ্য, দক্ষ ও সৎ, যারা দেশের কাজে লাগবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সব সময়েই হয়েছে জানিয়ে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, তবে আগের মতো ঢালাওভাবে যেন না হয়, সেই বিষয়ে নজর দিতে হবে।