কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরোঃ মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর আর ৩ অথবা ৪ দিন পরে উৎযাপিত হবে। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট নগরীতে ঈদের কেনাকাটা জমে উঠলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব ব্যাপকহারে পড়েছে বিপনীবিতান গুলোতে। ইউরোপ, আমেরিকা বাদে সিলেটের বৃহত্তর একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সন্ধ্যানে অবস্থান করছেন। এবার ইসরাইল, আমেরিকা ও ইরানে যুদ্ধের কারণে এর ব্যাপক খারাপ প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের মধ্যে। প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফুটাতে প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ঈদ করতে হাজার হাজার বাংলাদেশী সিলেটে আসলেও এবার কিন্তু তাদের অনেকেই আসতে পারেননি। আর যারা কয়েকমাস আগে এসেছিলেন তারা যেতে পারেননি। এ যেন প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে নীরব কান্না বয়ে যাচ্ছে। এরপরেও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে জমে উঠেছে সিলেটের ঈদ বাজার।

পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সিলেট নগরীর বিভিন্ন মাকের্ট-বিপণিবিতানে জমে উঠেছে কেনাকাটা। দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতারা ভিড় করছেন দোকানগুলোতে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিলেটের বেশিরভাগ লোকজন প্রবাসী, যাদের অনেকেই রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে; সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেননি। তাই এ বছর কেনাকাটা একটু কমেছে। এদিকে, ঈদের কেনাকাটার কারণে যানজট লেগেই আছে পুরো নগরীতে। যানজট নিরসনে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে।

গত শনিবার ও গতকাল রোববার বিকালে-রাতে নগরীর আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, লামাবাজার, বন্দরবাজার, জেলরোড, নয়াসড়ক ও কুমারপাড়া এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়। এসব এলাকায় দেখা যায়, ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে নানা রঙের আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে মার্কেট ও শপিংমল গুলো। বেশিরভাগ ক্রেতাই পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন। সবাই মিলে আগে পরিবারের ছোট সদস্যর জন্য পোশাক দেখছেন, দরদাম করছেন এবং কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কিশোর-তরুণদের কেউ দেখছেন জুতা-কেউবা আবার পছন্দের কাপড়টি ট্রায়াল দিয়ে দেখছেন, ভালো না লাগলে আবার নতুন করে খুঁজতে শুরু করছেন। তবে এবারের ঈদে তরুনীদের পছন্দের তালিকায় পাকিস্তানের থ্রি-পিস ও সারারা-গারারা রয়েছে। কিন্তু তরুণদের প্রথম পছন্দের তালিকায় রয়েছে তোব ও রঙ-বেরঙয়ের পাঞ্চাবী।

নগরীর জিন্দাবাজারস্থ আলহামরা শপিং সিটি, ব্লু ওয়াটার, সিসি সেন্টার, নারীদের পছন্দের বিপনীবিতান শুকরিয়া মার্কেট, অভিজাত বিপনী বিতান, নয়াসড়ক, কুমারপাড়া এলাকায় নামিদামি ব্র্যান্ড ও আধুনিক শপিংমলগুলোতে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের ভিড় বেশি। আর যারা দিনে আনে দিনে খায় তাদের পছন্দের মার্কেট ‘হাসান মার্কেট’ ও ‘হকার্স মার্কেট’। দিন কিংবা রাতে ভিড় যেন লেগেই আছে। বন্দরবাজারের হাসান মার্কেট ও হর্কাস মার্কেটে রয়েছে উপচে পড়া ভিড়। সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পোশাক, জুতা ও প্রসাধনী কেনাকাটা করছেন।

জিন্দাবাজারে আল হামরা শপিং সিটিতে কথা হলো নগরীর জালালাবাদ কলেজের শিক্ষার্থী মুবিনা আক্তারের সাথে। তার সাথে রয়েছে তারই চাচাতো বোন বুশরা আক্তার (স্নেহা)। মুবিনা এ প্রতিবেদককে জানান, ‘এবারের ঈদে তরুণীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে পাকিস্তানি থ্রি-পিস’। ২৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩০০০০ টাকায় এই থ্রি-পিস ও সারারা গারারা পাওয়া যাচ্ছে। মুবিনা নিজে এখনও কিনেন নাই তবে তার বড় বোন বুশরা কিনেছে পাকিস্তানি থ্রি-পিস ৭৫০০ টাকা দিয়ে। মুবিনা ব্লু ওয়াটার শপিং সিটিতে গিয়ে তার পছন্দের পাকিস্তানি থ্রি-পিস কিনবে বলে এ প্রতিবেদকে জানায়। শুধু এই পরিবারের এই দুই তরুণী নয়, তাদের সাথে এসেছে মুবিনার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছোট ভাই আব্দুল হাদি সবুজ ও বুশরার ছোট ভাই সদ্য এইচএসসি পাশ করা রিদওয়ান আহমদ। এ দুই তরুণের পছন্দের তালিকায় রয়েছে তোব ও পাঞ্জাবী। তারা শুকরিয়া মার্কেট কিংবা নয়াসড়কের অভিজাত বিপনীবিতান থেকে তোব ও পাঞ্জাবী ক্রয় করবে বলে এ প্রতিবেদককে জানান। তোব ও পাঞ্জাবী ১৮০০ টাকা থেকে ৬০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বন্দরবাজার এলাকায় মধ্যবিত্তদের মার্কেট নামে খ্যাত হাসান মার্কেটের কর্মচারি জাবের আহমদ বলেন, “সিলেটে ১৫ রমজানের পর থেকেই ঈদের বাজার শুরু হয়। তবে এ বছর দশ রমজানের থেকেই বেচাকেনা শুরু হয়েছে। এবার মেয়েদের থ্রি-পিস, ছেলেদের পাঞ্জাবি ও বাচ্চাদের পোশাকের চাহিদা বেশি। “এখন ক্রেতার চাপ অনেক বেড়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। আর আমাদের মার্কেটের আশপাশে তো সবসময়ই জ্যাম লেগেই আছে।’’

এদিকে নয়াসড়ক এলাকায় অভিজাত বিপণিবিতানে আসা নগরীর কুয়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা জামিল আহমদ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, “গত বছর যে বাজেটে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করেছি, এবার সেই বাজেটে হবে না। কারণ মার্কেটে এসে দেখি সব কাপড়ের দাম বাড়ানো। তবে কি আর করা, ঈদ বলে কথা, তাই বেশি দামেই সবার জন্য কাপড় কিনতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “এখান থেকে কাপড় কিনে জিন্দাবাজার গিয়ে জুতা কিনব সবার জন্য। এজন্য স্ত্রী, ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। দ্রুত কেনাকাটা শেষ করে বাসাতে ফিরতে চাই, কারণ বাসায় যেতে কয়েকটি পয়েন্টে যাটজট পড়তে হবে, আসার সময় যানজটে পড়েছিলাম।”

দাম বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন ব্যবসায়ীরাও। তারা জানান, ঈদের মৌসুমে পুরুষদের শার্ট-প্যান্ট ও পাঞ্জাবি, নারীদের দেশি-বিদেশি থ্রি-পিস, ফেব্রিক্স, গাউন ও বিভিন্ন ভাইরাল নামে আসা ড্রেস বেশি বিক্রি হচ্ছে। তবে বছরের চেয়ে এ বছর কাপড়ের দাম একটু বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নারীদের বিভিন্ন প্রসাধনী ও জুতার দাম। তবে নয়াসড়কের অভিজাত বিপনী আড়ং, অপরূপা (নবরূপা), মাহা, সাদিক টাওয়ার ও কুমারপাড়ার অভিজাত বিপনী বিতান নিয়ে বিত্তশালীদেরও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। ক্রেতারা বলছেন, যে পোষাকের দাম গত বছর যা ছিল এই বছর তার থেকে ২ থেকে ৩ গুন দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের তুলনায় জুতার দাম গড়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। প্রসাধনীর দামও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।

এছাড়া ঈদের কেনাকাটার কারণে অতিরিক্ত মানুষের চাপে নগরীতে বেড়েছে যানজট। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে জটলায় আটকে থাকতে হচ্ছে তাদের। এতে ভোগান্তি বেড়েছে নগরবাসীর। সকাল থেকেই গভীর রাত পর্যন্ত হাসান মার্কেট, মধুবন ও হর্কাস মার্কেট এলাকায় বিভিন্ন গাড়ির জটলা লেগেই আছে। যানজট ও মার্কেটে আসা ক্রেতা সাধারণের নিরাপত্তা দিতে এসএমপি পুলিশ দিনে রাতে কাজ করে যাচ্ছে। এসএমপি’র মুখপাত্র ও ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (নর্থ) সাইফুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে জানান, এবারের ঈদে নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি মার্কেটে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোষাকধারী পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। নারীদের নিরাপত্তা বিধানে প্রতিটি মার্কেটে সাদা পোষাকধারী নারী পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। যেকোন ধরনের ছিনতাই অপহরণ রোধে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত পুলিশের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

অপরদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে হামালার পর যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে সিলেটের ঈদবাজারে। অভিজাত শপিংমলের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সিলেটের বেশিরভাগ লোকজন প্রবাসী। তাদের পাঠানো টাকায় দেশে থাকা পরিবার বিভিন্ন খরচ ও কেনাকাটা করেন।

এর মধ্যে সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, আরব আমিরাত, ইরাক, আবু দাবি, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যে লাখ-লাখ সিলেটি প্রবাসী রয়েছেন; বর্তমানে সেখানে যুদ্ধের কারণে প্রবাসীরা কাজ থেকে বিরত রয়েছেন। অনেকে বাসা থেকে বাহিরেও বের হতে পারছেন না। এ জন্য টাকা পাঠাতে পারেননি অনেক প্রবাসী। তাই এ বছর কেনাকাটা একটু কমেছে, বলছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব ও সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, “ঈদবাজার রাতে জমজমাট হয়, দিনের বেলা ক্রেতাদের সমাগম কম। গত বছরের তুলনায় এ বছর ব্যবসা-বাণিজ্য কম হচ্ছে। আর প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে; বর্তমানে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে পারছে না। যার ফলে অনেকে কেনাকাটা করতে পারছেন না।”