‘পানির অপর নাম জীবন’—এই প্রবাদটি মূলত পানির অপরিহার্য গুরুত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, কারণ পানি ছাড়া কোনো জীব (উদ্ভিদ বা প্রাণী) বাঁচতে পারে না। মানবদেহের প্রায় ৬০-৭০% পানি দিয়ে গঠিত এবং শরীরের সব জৈবিক ও বিপাকীয় কার্যকলাপে পানির প্রয়োজন হয়। পানি শুধু জীবনধারণের জন্যই নয়, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। আর সেই পানিতে যদি থাকে বিষ!

রাজধানীতে যারা বসবাস করে থাকেন তারা সবাই ওয়াসার লাইন পানির উপরই ভরসা। কারণ, রাজধানীতে নলকুপ স্থাপন করার তেমন অনুমতি নেই। ওয়াসার সরবরাহকৃত এই পানিতে এবার দেখা মিলছে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদান।

এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কিছুদিন আগে একটা পোস্ট করেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন। পোস্টে তিনি দাবি করেন, রাজধানী ঢাকার সরবরাহকৃত ওয়াসার পানিতে PFAS (polyfluoroalkyl substances), কীটনাশক এবং ফার্মাসিউটিক্যালসের উপস্থিতি মিলেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

এবিষয়েও একদল গবেষক ঢাকা ওয়াসার পানিতে ক্যানসারের জীবাণু পাওয়ার তথ্য দিয়েছেন। তবে কোথায় থেকে কীভাবে পানির সঙ্গে এই জীবাণুর সংমিশ্রণ ঘটেছে অবগত নয় বলে দাবি করেছে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। পানির সঙ্গে এই জীবাণুর সংমিশ্রণ ঘটেছে তার প্রকৃত কারণও অজানা তাদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ঢাকার পানিতে পিএফএসের উপস্থিতি এক জরুরি সতর্ক বার্তা বহন করছে। এই পদার্থগুলো সহজে পরিবর্তিত হয় না এবং স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তারা বলছেন, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে মাটি, পানি ও বায়ুতে এই রাসায়নিক উয়াপাদানের উপস্থিতি আরও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের উৎপাদনে এসব ক্ষতিকর পদার্থের ব্যবহার অপসারণ করতে হবে। যেসব শিল্প-কারখানা এসব উপাদান ব্যবহার করছে তাদেরও সরে আসতে হবে।

পিএফওএস এবং এর সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলো অগ্নিনির্বাপক ফোম, কার্পেট, চামড়ার পণ্য, গৃহসজ্জা সামগ্রী, প্যাকেজিং, ঘর এবং কারখানা পরিষ্কারকারী পণ্য, কীটনাশক, ফটোগ্রাফ্রিক অ্যাপ্লিকেশনস, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, হাইড্রোলিক ফ্লুইডস, ক্যাথেটার এবং ধাতব প্ল্যান্টিং ইত্যাদি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ণ বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য প্যানিক সৃষ্টি করা না। আমরা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হাতে গবেষণা প্রতিবেদনটি দিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম সুইডেনের ল্যাবে পরীক্ষা ঢাকা ওয়াসার পানিতে ৬০০-৭০০ জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিন্তু এগুলো কোথায় থেকে কীভাবে ওয়াসার পানিতে সংমিশ্রণ ঘটেছে সেটা খুঁজে বের করতে হলে বিশদ গবেষণার দরকার। এ জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষ যেন সেই দায়িত্ব নেয় সেটাই বলা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত ওয়াসা থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারপারসন ড. আবু জাফর মাহমুদ বলেন, পিএফএএস অত্যন্ত বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ। মানব দেহের রক্ত থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত উপাদানগুলো প্রভাব রাখে। এদের প্রভাবে ক্যান্সার হতে পারে। আমরা মার্কারি এবং সীসার ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে জানি। তবে পিএফএএসের সংস্পর্শে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। এই উপাদানগুলো জন্মের আগেই শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের পরিচালক জানান, স্টকহোম কনভেনশন ইতোমধ্যে রসায়নিক এই উপাদানগুলোকে পারসিসটেন্ট অরগ্যানিক পলিউট্যান্টস হিসেবে চিহ্নিত করছে। আমরা আগামী ছয় মাসের মধ্যে নতুন করে যুক্ত এই উয়াপাদানগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিব। পরবর্তীতে আমরা যথাযথ আইনের মাধ্যমে কেমিক্যালগুলোর উৎপাদন এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিহার সংক্রান্ত আদেশ জারি করব।

ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, বাংলাদেশে কোন কোন পণ্যে এসব পদার্থ ব্যবহৃত হচ্ছে তা আমরা পরিষ্কার জানি না। উপাদানগুলোর উৎস সংক্রান্ত কোনো গবেষণাও নেই। সাধারণত তেল পরিশোধক, শক্তি উৎপাদনকারী, জাহাজ-ভাঙা, প্রসাধন প্রতিষ্ঠান, কাঠ, রঙ, কাগজ এবং পাল্প, পরিষ্কারক, মোম এবং মেঝে পলিশ, অগ্নিনির্বাপক ফোম, পিভিসি এ রাবার কারখানা এবং ফটোগ্রাফি শিল্পে কেমিক্যালগুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল সুইডেনের Umea University-এর সহযোগিতায় সুইডেনের একটি ল্যাবরেটরিতে ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন স্থানের পানির নমুনা পরীক্ষা করে এসব উপাদান শনাক্ত করেছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে কৃষি রসায়ন বিভাগের ড. আরিফ ও ড. কাইউমের নামও উল্লেখ করেন তিনি।

মাহবুব কবির মিলন জানান, একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই লিটার পানি পান করেন। সেই হিসেবে প্রতিদিনই শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ক্ষতিকর কেমিক্যাল প্রবেশ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।