- বিরোধী দলের “নোট অব ডিসেন্ট”
- ৯৮টি অধ্যাদেশ অবিকল পাস হচ্ছে, ১৫টিতে সংশোধন
গণভোট, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপন করছে না সরকার। ফলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা ‘ল্যাপস’ হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানালেও সরকার গণভোটসহ উল্লেখিত অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করছে না। তবে জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি এগুলো এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও যাচাই-বাছাই করে নতুন করে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে তা উত্থাপন করতে হয়। উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত না হলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পায়। সেই হিসেবে আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে এই ১৬টি অধ্যাদেশ ল্যাপস হয়ে যাবে। ১২টি অধ্যাদেশের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছেন।
গত (বুধবার) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে বিশেষ কমিটির রিপোর্টটি উত্থাপন করেন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। বিলগুলো দ্রুত পাস করার জন্য আগামী রোববার সংসদে বিল উত্থাপন করার জন্য মন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান স্পীকার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ বর্তমান আকারেই পাসের জন্য সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। অবশিষ্ট ১৫টি সংশোধিত আকারে এবং ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই সংসদে না পাঠিয়ে আরও সময় নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি।
যে ১৬টি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে
গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ-২০২৫, মাইক্রো ফাইনান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।
জামায়াতের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ও স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গ
বিশেষ কমিটির রিপোর্টে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম মোট ১২টি অধ্যাদেশের ওপর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দিয়েছেন। বিশেষ করে জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, উপজেলা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪-গুলোর তীব্র বিরোধিতা করেছেন তারা।
তাদের মতে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায় অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ অসাংবিধানিক ও বেআইনি। ফলে এই অধ্যাদেশগুলো আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এখনই বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ ৪ টির
প্রতিবেদনে চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলোÑ জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ-২০২৪, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।
সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ ১৫টির
সংশোধিত আকারে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা ১৫টি অধ্যাদেশ হলোÑ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন)-২০২৫, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫, সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ-২০২৫, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন অধ্যাদেশ-২০২৬, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।