হাম আক্রান্ত সব শিশুকে হাসপাতালে নেয়ার দরকার নেই। হাম আক্রান্ত শিশু খেতে না পারলে, শ্বাসকষ্ট হলে, খিঁচুনি হলে বা অচেতন হয়ে পড়লে তখনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এর আগে ঘরেই ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা চলবে। গতকাল সেমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত হামরোগ বিষয়ক সেমিনারে শিশু বিশেষজ্ঞরা কথা বলছিলেন। তারা আরো বলেন, হাম আক্রান্ত শিশু কাশি দিলে জীবানু চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তা থেকে কমপক্ষে ৯০ জন আক্রান্ত হয়। এটা বাতাসে ভেসে বেড়ালেও ২ থেকে ৩ ঘন্টা বেঁচে থাকে। যেদিন থেকে শিশুর শরীরে লালদাগ বা র্যাশ দেখা দেবে সেদিন থেকে পরবর্তী ৪ দিন শিশুর বিপজ্জনক অবস্থা থাকে।

এনডিএফ’র সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো: নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন এনডিএফ’র জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ডা. আব্দুর রাকিব, অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ডা. খয়বর আলী, অধ্যাপক ডা. আহমেদ মুর্তজা, অধ্যাপক ডা. মো: আতিয়ার রহমান এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো: শহীদুল ইসলাম। হামের উপর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশনের শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সহকারি অধ্যাপক ডা. মো: আবু তালহা।

বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসকরা বলেন, হাম একটি ভাইরাস, এর ওষুধ না থাকলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা লক্ষণ বুঝে বুঝে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন এবং শিশুরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। তবে টিকা নেয়া হলে শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। প্রাদুর্ভাবের সময় ৯ মাসে হামের টিকা নেয়ার পরও শিশুকে আবার টিকা দেয়া যাবে, কোনো সমস্যা হবে না। হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য আইসোলেশন বা আলাদা করে রাখাটা খুবই জরুরি। এটা একটি ভাইরাস, এতে আক্রান্ত হলে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুকে নিরাপদ করে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, মায়ের শরীরের এন্টিবডিতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৬ মাস শিশুর হাম হয় না। আক্রান্ত শিশুরা মারা গেছে ৯ মাস হওয়ার আগেই।

তিনি বলেন, এই মুহূর্তে প্রতিটা হাসপাতালে কিছু বেড আলাদা করে রাখতে হবে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য যেন প্রচন্ড ছোঁয়াচে এই জীবানুটি অন্য শিশুদের জন্য আক্রান্ত করতে না পারে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মসজিদের ইমামসহ অন্য কমিউনিটি লিডারদের ট্রেনিং দিতে হবে যেন মানুষকে সচেতন করতে ভূমিকা রাখে।

ডা. মুহাম্মদ আবু তালহা বলেন, হাম রোগে ভিটামিন ‘এ’র ভূমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এই রোগে এটি জীবনরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। এটি শিশুদের মৃত্যুহার, জটিলতা এবং অসুস্থতার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এছাড়া তিনি বলেন, ভিটামিন ‘এ’ নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমায়; চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্ব প্রতিরোধ করে এবং মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ হাম আক্রান্ত সব শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে, ঘাটতি থাকুক বা না থাকুক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুকে ভিটামিন ডোজ দেয়া মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুকে প্রতি ২৪ ঘন্টায় ৫০ হাজার আইইউ ভিটামিন ‘এ’ একদিন পর পর দুইবার দিতে হবে অর্থাৎ ১ম দিন ও ২য় দিন দিতে হবে অর্থাৎ দুই দিনে ৫০ হাজার করে মোট এক লাখ ইউনিট আইইউ ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে। এছাড়া ৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশকে এক লাখ ইউনিট আইইউ ভিটামিন ‘এ’ পর পর দুইবার দিতে হবে (দুইদিনে দুইবার)। এছাড়া ১২ মাস অথবা এর চেয়ে বেশি বয়সী শিশুকে দুই লাখ আইইউ ভিটামিন ‘এ’ পর পর দুইদিন দিতে হবে। কোনো শিশুর চাখের সমস্যা থাকলে ২৪ সপ্তাহ পর আরো এক ডোজ ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো- হাম রোগে আক্রান্ত শিশুকে অবশ্যই অবশ্যই ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে। তাহলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।

শহীদুল ইসলাম বলেন, সচেতনতা বাড়ানো দরকার ছিল, এর বাইরেও শিশুরা মারা যাচ্ছে। নতুন নতুন যে রোগ আসে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। ডাক্তাররা অনেক পরিশ্রম করেন, কিন্তু মিডিয়ায় কেবল ডাক্তারদের নেগেটিভ দিকটাই আসে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো: নজরুল ইসলাম বলেন, এই সেমিনারের সুপারিশগুলো আশা করছি সরকার বাস্তবায়ন করবে। সারাদেশে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনে ভ্যাকসিন কাভারেজ নিশ্চিত করতে হবে।