১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে ঘিরে দেশের আলেম ওলামা, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মুসল্লিসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমতার সেই দিন। হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করে। হেফাজতের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে দিনভর উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়ায় তখনকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই রাতে রাজধানীর অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের শাপলা চত্বর ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক ভীতিকর পরিবেশ।
বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়ায় ওই এলাকায় নেমে আসে ঘুট ঘুটে অন্ধকার। শাপলায় অবস্থানকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির শত শত সদস্য পল্টনের তোপখানা মোড়, ফকিরাপুল ও দিলকুশা এলাকায় প্রস্তুত থাকে। সমাবেশে আগতদের সরিয়ে দিতে খোলা রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কমলাপুর স্টেশন যাওয়ার এবং বঙ্গভবনের দিকের রাস্তা। গভীর রাতে ঘুমন্ত আলেম ওলামা, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর হঠাৎ অ্যাকশন শুরু করে পুলিশ-র্যাব ও বিজিবি। তাদের অভিযানে রক্তাক্ত হয় শাপলা চত্বর। সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আতঙ্ক ছড়ানো হয়। অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে রাতভর নির্মমতা চালানো হয়। সেই রাতে গুলী করে হত্যা করা হয় ধর্মপ্রাণ বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে। প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা কত তা এখনো জানা যায়নি। তবে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা। আর মানবাধিকার সংগঠন অধিকার জানায়, সেদিন ৬১ জনকে হত্যা করা হয়। গুলীবিদ্ধ হয়েছেন বহু মানুষ।
কী ঘটেছিল সেই রাতে
হেফাজতের পূর্ব ঘোষিত সমাবেশে যোগ দিতে সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীরা এসে রাজধানীর ছয়টি প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়েছিলেন। একপর্যায়ে হেফাজতের নেতারা সিদ্ধান্ত নেয়, একটি সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে। এ জন্য তারা বেছে নেন মতিঝিলের শাপলা চত্বরকে, যেখানে ঠিক এক মাস আগে (৬ এপ্রিল) তারা লংমার্চ কর্মসূচি শেষে সমাবেশ করেছিলেন। মূলত ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘিরে শুরু থেকেই তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের দলীয় লোকজন ছিলেন মারমুখী। বিভিন্নস্থানে হেফাজতের সমাবেশে যোগ দিতে আসা লোকজনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্নস্থানে উত্তাপ ছড়াচ্ছিল। শাপলা চত্বরে সমাবেশের ব্যাপারে হেফাজত নেতারা প্রশাসনের সঙ্গে দেন দরবার করছিলেন। এক পর্যায়ে অনুমতি মেলে। তবে ডিএমপির শর্ত ছিল শুধু মোনাজাত করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হবে আয়োজন। তবে দিনভর গুলিস্তান, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। একপর্যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী লালবাগ মাদরাসায় অবস্থান করছিলেন। কথা ছিল, তিনি এসে দোয়া করে অবস্থান কর্মসূচি সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। তিনি মতিঝিলে আসার জন্য রওয়ানাও দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূলে চলে গিয়েছিল যে, তিনি আর আসতে পারেননি। হেফাজত থেকে বলা হয়েছে- গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাকে সমাবেশে আসতে দেয়নি। এরই মধ্যে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। এদিকে এভাবে কর্মসূচি সমাপ্ত ঘোষণা করলে নানা স্থানে নেতাকর্মীরা হামলার শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে হেফাজত নেতারা রাতে সেখানেই অবস্থানের ঘোষণা দেন।
এই পরিস্থিতিতে সরকার ছিল চরম আতঙ্কে। তাদের ধারণা ছিল, কোনোমতে হেফাজত নেতাকর্মীরা শাপলা চত্বরে রাতভর অবস্থান নিয়ে থাকলে সকালে তাদের সঙ্গে অন্যান্য বিরোধী দলগুলো যুক্ত হবে। এতে সরকারের পতন হয়ে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকে সরকার মরণকামড় দেয়। যেকোনো মূল্যে হেফাজতকে সেখান থেকে সরাতে হবে সেই সিদ্ধান্ত হয় সরকারের উচ্চ মহলে। সরাসরি তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গভীর রাতে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি সন্ধ্যায় একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে হেফাজতকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে জানান। তখনই আঁচ করা যাচ্ছিল রাতে ভয়াবহ কিছু হবে। পুরো অপারেশনের নেতৃত্ব দেয় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। তিনি তখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার। পুলিশের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’, র্যাবের ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট শাপলা’ এবং বিজিবির ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
গভীর রাতে সাঁড়াশি অভিযান
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে যখন রাতে হেফাজত নেতারা বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন হঠাৎ বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। চারদিক ছেয়ে যায় অন্ধকারে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে তখন হেফাজতের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মুসল্লিদের সরিয়ে দিতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির বিপুলসংখ্যক সদস্য প্রস্তুত হন পল্টন, ফকিরাপুল ও দিলকুশা এলাকায়। হেফাজতের লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য খোলা রাখা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কমলাপুর স্টেশন যাওয়ার রাস্তা এবং বঙ্গভবনের দিকের রাস্তা। প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক গণমাধ্যমকর্মীর মতে, রাত দেড়টার দিকে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা শাপলা চত্বরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। প্রথমে হাতমাইক ব্যবহার করে অবস্থানকারীদের সরে যেতে বলেন। এরপর রাত পৌনে তিনটায় মূল অভিযান শুরু করা হয়। হেফাজতের সমাবেশেই প্রথম ঢাকায় সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ-তিন বাহিনীর সদস্যরা ফাঁকা গুলী আর কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে থাকেন। থেমে থেমে সাউন্ড গ্রেনেডও ব্যবহার করা হয়। শত শত ফাঁকা গুলী, সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ এবং অন্ধকার এলাকায় এসবের আলোর ঝলকানি মুহূর্তেই ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। ১০ মিনিট ধরে চলে এ পরিস্থিতি। এরই মধ্যে একপর্যায়ে মঞ্চের মাইক বন্ধ হয়ে যায়। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ফাঁকা গুলী, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে এগোতে শুরু করেন শাপলা চত্বরের দিকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তোপখানা মোড় থেকে এগোনো শুরু করার পর ১০ মিনিটেই পৌঁছে যান শাপলা চত্বরে। ট্রাকের ওপর ভ্রাম্যমাণ মঞ্চও খালি করা হয়েছিল মুহূর্তেই। অভিযানের সময় হেফাজতের শত শত কর্মীÑসমর্থক মতিঝিল এলাকায় সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পুলিশ পুরো এলাকার দখল নেওয়ার পর বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নেওয়াদের বের করে এনে এলাকা ছাড়া করা হয়। ভোর চারটার সময়ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থেমে থেমে ফাঁকা গুলী ছুড়ে আশপাশের ভবনগুলোতে তল্লাশি চালায়। ওই সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অভিযানে শাপলা চত্বর খালি করার পর বলেছিলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম বিড়ালের মতো লেজ গুটিয়ে চলে গেছে।’ রাতের অভিযানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়। আড়াই হাজারের মতো নিহত হওয়ার অভিযোগ তুলেছিল বিভিন্ন দল। তবে পুলিশ বলেছিল, অভিযানের সময় আহত একজন পরে হাসপাতালে মারা যান। আর দিনের সহিংসতায় নিহত চারজনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল মঞ্চের কাছে একটি ভ্যানে। ৫ মে দিনের সহিংসতা এবং পরদিন ৬ মে দুই দিনে সারাদেশে সহিংসতায় ২৮ জনের নিহত হওয়ার কথা বলেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে পুলিশের গোপন রিপোর্টে ১৯১ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে জানা যায়।
ঘটনার ১১ বছর পর মামলা
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ‘গণহত্যা’ চালানোর অভিযোগে জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) মো. জাকী-আল-ফারাবীর আদালতে করা এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনকে আসামী করা হয়। মামলাটি করেন বাংলাদেশ পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বাবুল সরদার চাখারী। মামলার তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মতিঝিল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন আদালত। এ মামলায় অন্য আসামীদের মধ্যে আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, পুলিশের যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার, মতিঝিল থানার সাবেক ওসি ওমর ফারুক প্রমুখ। এর পরের মাসেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের পক্ষে অভিযোগ করা হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিচার কোন পর্যায়ে
শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা। গণহত্যার এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। আগামী মাসের (জুন) প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত এ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘঠিত গণহত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত চলমান রয়েছে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ ১২ জন ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামী। এর মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন-সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান ও পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম। শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অপর আসামীরা হলেন-সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম রোববার জানান, ‘ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে শাপলা চত্বরের গণহত্যার ঘটনা তদন্ত করছে। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তে চট্টগ্রামের কিছু কাজ বাকি আছে। এরপর চলতি মাসের শেষে কিংবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে সক্ষম হবে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সব আসামীর নাম প্রকাশ করা ঠিক হবে না। এ হত্যাকাণ্ডে অর্থায়নকারী ও বিভিন্নভাবে সহযোগীদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।
অধিকারের প্রতিবেদন
৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হতাহতদের নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে অন্তত ৬১ জন নিহতের তথ্য জানিয়েছিল অধিকার। প্রতিবেদনে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নিয়ে চালানো হত্যাযজ্ঞটি তৎকালীন সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দোষীদের শাস্তিসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানায় অধিকার। প্রতিবেদনে জানানো হয়, তৎকালীন হাসিনা সরকারের নির্দেশে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। তাদের সুপারিশে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং এই ঘটনায় দায়ের করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর ওই প্রতিবেদনে আহত ও নিহতদের তালিকার পাশাপাশি ওই রাতে কীভাবে গুলী চালানো হয়েছে, তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল। অধিকারের সরেজমিন প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট রাতে ‘অধিকার’ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে তার বাসার সামনে থেকে তুলে নেয় পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাকে সারা রাত গুম করে রাখা হয় এবং পরদিন আদালতে তোলা হয়। পরে ৫৪ ধারায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আদিলুর রহমান খান এবং অধিকারের পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০০৯)-এর আওতায় মামলা দেওয়া হয়। এ মামলায় তারা যথাক্রমে ৬২ দিন এবং ২৫ দিন কারাগারে ছিলেন। এরপর এ সংক্রান্ত মামলায় ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদিলুর রহমান খান এবং নাসির উদ্দিন এলানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।
গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের লাখো জমায়েতের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পরিকল্পিত নৃশংস গণহত্যায় অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ শহীদ হন। হাজার হাজার আলেম, হাফেজ ও নবীপ্রেমিক জনতা আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। আমরা ৫ মের মহান শহীদদের স্মরণে সারা দেশে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করার জন্য হেফাজতের নেতাকর্মীসহ সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তারা আরো বলেন, ৫ মের গণহত্যার দায়ে পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতে ইসলাম-এর পক্ষ থেকে করা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের জোর দাবি দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শাপলা চত্বরের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করুন।
কর্মসূচী
আজ মঙ্গলবার ৫ মে শাপলা চত্বরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগে নেতৃত্বাধীন সরকার কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। গতকাল সোমবার এক বার্তায় শিবির জানায়, দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে এই কর্মসূচি পালন করা হবে।
এদিকে ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার উদ্যোগে ‘‘শাপলা ও শাহবাগ : মুসলিম রাজনৈতিকতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্বৈরথ” শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজআমান ফুয়াদ ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ বিশিষ্টজনরা বক্তব্য দিবেন।
শাপলা চত্বরে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো একটি তথ্যচিত্র ও দলিলভিত্তিক প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৫ ও ৬ মে রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে এটি অনুষ্ঠিত হবে। এতে ঘটনার আলোকচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, প্রামাণ্য দলিল, সংবাদ প্রতিবেদন এবং শহীদদের স্মৃতিচারণ উপস্থাপন করা হবে। পাশাপাশি থাকবে তথ্যচিত্র প্রদর্শন ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা পর্ব। ৫ মে বিকেল ৩টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা ও আহত ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।
এছাড়া জাস্টিস এন্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জিডিপি) উদ্যোগে শাপলা গণহত্যা দিবস উপলক্ষে শাপলার শহীদদের স্মরণে আমাদের সাদা পাঞ্জাবির মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার রাত ৮টায় মিছিল শাহবাগ চত্বর জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে শুরু হয়ে টিএসসিতে গিয়ে শেষ হবে।