‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, সাবেক সেনা কর্মকর্তারা ও রাজনীতিবিদরা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বিএনপির সরকার যদি গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে তবে পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামীদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। গণভোটের জনরায় বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।
গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। সংলাপে “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ: আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
নেক্সাস ডিফেন্স এন্ড জাস্টিস প্রেসিডেন্ট ব্রি জে অব. মোহাম্মদ হাসান নাসিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, সাবেক সচিব ও রাজনীতিবিদ এএফএম সোলায়মান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) আক্তারুজ্জামান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী, গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফারুক হাসান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, রাজনীতিবিদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকীব আলী, সাবেক সিনিয়র সচিব ড এ কে এম কবিরুল ইসলাম, সাবেক সচিব আবদুল হালিম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন লিপু, বিডিজবস এর প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর, প্রফেসর লে. ক আকরাম আলী, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি ব্যারিষ্টার বেলায়েত হোসাইন, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, মেজর (অব) মোজাম্মেল হোসাইন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মেঃ জেঃ (অব) আমসাআ আমিন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ কর্নেল (অব) আশরাফ আল দীন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর (অব) আফসারী আমিন, মেজর (অব) মেসবাহুল ইসলাম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট তাসমিন রানা প্রমুখ। উপস্থাপনায় ছিলেন যথাক্রমে, নেক্সাস ডিফেন্স এন্ড জাস্টিসের লীড মেম্বার ক্যাপ্টেন (অব) জাহাঙ্গীর, লীড মেম্বার রাব্বুল ইসলাম খান, মেজর (অব) আবদুল্লাহ আল ফারুকী ও মিনহাজুল আবেদীন।
মূল প্রবন্ধে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সফল গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে যে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে ৮ আগস্ট ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী জনগণের ইচ্ছা এই সরকারের বৈধতার স্বীকৃত উৎস। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়ে এর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। সরকার গণভোটের জনরায় বাস্তবায়ন না করলে দেশে একটি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির তার প্রবন্ধে বৈশ্বিক নজির টেনে বলেন, ফ্রান্স, ইরান, ফিলিপাইন বা মিশরের মতো দেশগুলোতেও বিপ্লব পরবর্তী সরকার গঠিত হয়েছে এবং আদালত জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকেই চূড়ান্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশেও সুপ্রিম কোর্ট তার বিভিন্ন রায়ে (যেমন: সিভিল পিটিশন ৭৮১/২০২৫) এই সরকারের বৈধতা ও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে (ঈড়হংঃরঃঁবহঃ চড়বিৎ) স্বীকৃতি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অতীতে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংসদে কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও এটি সংস্কারের পথে অন্তরায় হতে পারে। প্রবন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনের আগের ও পরের অবস্থানের পরিবর্তনের সমালোচনা করা হয়। বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের পূর্ববর্তী ‘সার্বভৌম জনরায়’ সংক্রান্ত বক্তব্যের বিপরীতে বর্তমান ধীরগতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দোহাই সংস্কারের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, গণভোট গণতন্ত্রের সেইফটি ভাল্ব, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সংবিধানে গণভোটের বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বিএনপির কাছে এটি তাদের রাজনৈতিক দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিধান বাতিল হওয়া মানে তাদের দলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ‘লিগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকার মুছে যাওয়া। তিনি বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল হলে ‘সংসদীয় একনায়কতন্ত্রের’ ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যদি সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকে, তবে ক্ষমতাসীন দল সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সংবিধানের যেকোনো ধারা পরিবর্তন করতে পারে। এতে করে; শাসক দল তাদের সুবিধামতো সংবিধান সাজিয়ে নিতে পারে। বিরোধী দল বা সাধারণ মানুষের মতামতের কোনো আইনি গুরুত্ব থাকে না। ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার কিছু দোসর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। জনগণের বিজয়ের ফল হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের নিকট প্রশ্ন রাখতে চাই-সেদিন সংবিধানের কোন ধারাবলে গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল? সেদিন গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হতো না, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাই ক্ষমতায় থেকে যেতেন। জুলাই সনদও হতো না এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনও হতো না। তিনি বলেন, গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করা হলে বিএনপির সরকারকে পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই পরিণতি ভোগ করতে হবে। অবিলম্বের ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের জনরায় বাস্তবায়নের দাবি করছি।
মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) আক্তারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে অনেকে সংবিধানের মধ্যে সব সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই সরকার সংবিধানের ভিত্তিতে নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের ওপর ভিত্তি করে গঠিত সরকারের অধীনে নির্বাচিত হয়েছে। তাই সমাধানও খুঁজতে হবে জনগণের সেই সার্বভৌম অধিকারের জায়গায়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা এখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিতর্ক তুলছেন, তারা কি গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করছেন, নাকি ভুলে গেছেন?
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে জনগণের সম্মতি রয়েছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়। জনগণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত প্রস্তাবের পক্ষে তাঁদের রায় দেন। জুলাই জাতীয় সনদ অস্বীকার বা কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করা বর্তমান সরকারের জন্য আত্মঘাতী হবে বলে মন্তব্য করেছেন রাশেদ প্রধান ।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, জুলাই সনদ একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল। তাই এ বিষয়ে আদালতের রুল জারি করা বা হস্তক্ষেপ করা এখতিয়ার বহির্ভূত। এই সনদ কোনো সাধারণ দলিল নয়, বরং হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক রাজনৈতিক ঐকমত্য। একে প্রশ্নবিদ্ধ করার অর্থ হলো গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে অস্বীকার করা।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আমরা বস্তুত জুলাই শহীদ ও আহতের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। এই যে জুলাই সনদ, এটি দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে তারা স্বাক্ষর করেছেন। এখন যদি এখান থেকে পিছিয়ে আসা হয় বা নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়, তবে তা হবে চরম আত্মঘাতী।’
গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, জনগণ সরাসরি গণভোটে তাদের মতামত দিয়েছে, এটাই চূড়ান্ত। এর সঙ্গে অন্য কিছু গুলিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি না করে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া।’
সাবেক সচিব ও রাজনীতিবিদ এএফএম সোলায়মান চৌধুরী বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ দুটি শপথ (সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য) পাঠ করতে আইনানুগভাবে বাধ্য বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এখন বিএনপির সরকার গড়িমসি করছে। সংবিধানে গণভোট অধ্যাদেশ না থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজপথের সংঘাতে রাস্তা তৈরি হবে।
মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বতীকালীন সরকারের পরামর্শক্রমে, রাষ্ট্রপতি এই (জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট অধ্যাদেশ) আদেশ জারি করেন গত বছরের ২৫ নভেম্বর। এই আদেশের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০% জনগণ রায় দেয় তা এখন বাস্তবায়ন করতে হবে।
রাজনীতিবিদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকীব আলী বলেন, যখন কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত যাচাইয়ের আইনি বা সাংবিধানিক পথ (যেমন: গণভোট) বন্ধ হয়ে যাবে, তখন মানুষ তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথের আন্দোলনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ দেশে আবারও তৈরি হয় এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো সরকারকে পালিয়ে যেতে হবে।
সাবেক সিনিয়র সচিব ড এ কে এম কবিরুল ইসলাম বলেন, যারা জুলাই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তারা মূলত গণঅভ্যুত্থানকেই অস্বীকার করছেন। তারা গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাটুকু নেবেন আর অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত স্পিরিট কে অস্বীকার করবেন-এ দ্বৈততা জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। জনগণ আবারও রাস্তায় নেমে আসবে এবং দেশের আবারও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিবেশ তৈরি হবে যদি গণভোটের রায় বাস্তবায় না করে।
সাবেক সচিব আবদুল হালিম বলেন, গণভোটের রায়ের মাধ্যমে জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা কখনো কাম্য নয়। অবিলম্বে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডেকে তা বাস্তবায়ন করুন। এতেই বিএনপির সরকারের জন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন লিপু বলেন, সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা না থাকলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার অভাব তৈরি হয়। গণভোটের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদী নৈতিক ভিত্তি পায়। কিন্তু কেবল সংসদীয় ভোটে পাস হওয়া আইন পরবর্তী যেকোনো সরকার সহজেই বদলে দিতে পারে। এতে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলোতে ঘনঘন পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকে, যা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বিডিজবস এর প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলে জবাবদিহিতার সংকট তৈরি হয়। গণভোট ব্যবস্থা শাসক গোষ্ঠীকে একটি পরোক্ষ চাপে রাখে যে, কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলে জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে হবে। এই ব্যবস্থা না থাকলে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জনবিচ্ছিন্নতা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান অহেতুক বিতর্ক বা বিভক্তি সৃষ্টি করলে রাজনৈতিক অনৈক্য তৈরি হবে। এই অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে অপশক্তিরা ফিরে আসার পথ খুঁজে পেতে পারে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি ব্যারিষ্টার বেলায়েত হোসাইন বলেন, অতীতের সব সরকার বাহাত্তরের সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার সংবিধানে রূপ দিয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধান ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে রচিত। এজন্য বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে বাহাত্তারের কাটাছেঁড়া সংবিধান রক্ষা করতে উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে তারা জুলাই সনদ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করবে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পথে হাঁটছে। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদে বিএনপি সহ রাজনৈতিক দল গুলো স্বাক্ষর করার পর জুলাই সনদ নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু থাকে না, এখন শুধু সনদ বাস্তবায়নের বাকি। জুলাই সনদে নিজেদের স্বাক্ষরের প্রতি সম্মান জানিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
নেক্সাস ডিফেন্স এন্ড জাস্টিস প্রেসিডেন্ট ব্রি জে অব. মোহাম্মদ হাসান নাসির সভাপতির বক্তব্যে বলেন, জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির স্বার্থে নয়, বরং দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। সংবিধান সংশোধনের চেয়ে ‘সংবিধান সংস্কার’ প্রক্রিয়াই হবে সহজ ও টেকসই সমাধান। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, অতীতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চার ফলে যেভাবে শাসনব্যবস্থার পতন হয়েছে, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।
গোলটেবিল সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষারই পরিপূরক। এই সুযোগকে কোনো অজুহাতে হাতছাড়া করা সমীচীন হবে না। বক্তারা অবিলম্বে গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।