বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বর্তমানে দৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুই দেশের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ আরও জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক মুসলিম ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনকে ভিত্তি করে এই সম্পর্ক বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। উভয় দেশেই এফওসি বৈঠকের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ চলছে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান তুরস্কের ‘এশিয়া অ্যানিউ’ নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন গড়তে সহায়ক। বিশেষ করে তুরস্ক বাংলাদেশেকে সামরিক সহায়তা দিতে আগ্রহী। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার ঢাকা সেনানিবাসস্থ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার ব্রিগেডিয়া জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেনের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর)-এর সূত্রে এই তথ্য জানায়। আইএসপিআর জানায়, সাক্ষাৎকালে তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গত বছরের অক্টোবরে এফওসি বৈঠকে দুই দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের জন্য তুরস্কের অস্ত্র ও সরঞ্জাম আগেও কিনেছে, সামনেও কেনার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত তিন হাজার সামরিক কর্মকর্তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে তুরস্ক। তুরস্ক ও বাংলাদেশ একে অপরের কাছ থেকে ড্রোন ক্রয়-বিক্রয় করতে সম্মত হয়েছে। অস্ত্র উৎপাদনে একটি যৌথ কোম্পানি গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করছে দুটি দেশ। ইতোমধ্যে তুর্কি একটি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তিও হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হলে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।
তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি কূটনৈতিক বিশ্লেষক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দরকার। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান দেশ এবং তুরস্ক একটি মধ্যম মানের শক্তি। তুরস্কের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা ন্যাটোর মানসম্পন্ন এবং এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ আছে বলে এই বিশেষজ্ঞের অভিমত। তিনি আরও বলেন, তা ছাড়া আমরা যৌথ মিলিটারি সরঞ্জাম উৎপাদন করতে পারি বা তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে উৎপাদন করতে পারি। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি অত্যন্ত ভালো এবং উদ্যোগ নেয়া হলে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে উন্নত মানের ড্রোন উৎপাদন সম্ভব। কারণ বাংলাদেশের যুব প্রকৌশলীর সংখ্যা অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কারখানায় তুরস্কের বায়রাকতার টেকনোলজিস বা তাদের সহযোগী কোনো প্রতিষ্ঠান অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের তরফ থেকে বিমান বাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, যৌথ উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ নিজস্ব ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করবে এবং বিদেশ নির্ভরতা অনেকাংশে কমে যাবে। তুরস্কের অত্যাধুনিক বায়রাকতার ঞই২ ও আকিনজি সিরিজের ড্রোন প্রযুক্তি যৌথ উদ্যোগে অন্তর্ভুক্ত হলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও নজরদারি সক্ষমতা নতুন মাত্রা পাবে।
সামরিক সহযোগিতা: ২০২৫ সালের জুনে দুই দেশ বাংলাদেশে যৌথ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের ঘোষণা দেয়, যেখানে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা যাবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা বাড়াবে। বাংলাদেশ বর্তমানে তুরস্কের তৈরি অস্ত্রের চতুর্থ বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো; যেমন: বাইকার (ড্রোন) ও রকেটসান (মিসাইল) বাংলাদেশকে উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ করছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন ও সাঁজোয়া যান।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প বিভাগের প্রধান হালুক গোরগুনের ঢাকা সফর এই সহযোগিতাকে আরও দৃঢ় করে। এ সময় বাংলাদেশ সেনাপ্রধান ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানান। এই সহযোগিতা বাংলাদেশের সেনা আধুনিকায়ন কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি তুরস্ককে দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের শিকড় মধ্যযুগে প্রোথিত যখন বঙ্গীয় ব্যবসায়ী ও পণ্ডিতরা সামুদ্রিক পথে অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। আধুনিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৭২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর একটি। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তুরস্কের অব্যাহত সমর্থন বাংলাদেশের কাছে প্রশংসিত। ২০২৫ সালে টিআইকেএ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণে অর্থায়ন করেছে। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মানুষে-মানুষে সম্পর্ক প্রাণবন্ত ও আন্তরিক। প্রতিবছর তুরস্কে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। এদের অনেকে ইউনুস এমরে ইনস্টিটিউট ও তুরস্কের সহযোগিতা সংস্থা টিআইকেএ-র বৃত্তিতে পড়াশোনা করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তুরস্ক বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে আঙ্কারা বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারা প্রশাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়ছে, যদিও এখনো সম্ভাবনার তুলনায় কম। বাংলাদেশ তুরস্ককে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সেতু হিসেবে দেখে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ তুরস্কে ৪৯৫.৮১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের মধ্যে প্রস্তুত তৈরি পোশাক, ওষুধ ও পাটজাত দ্রব্য প্রধান। অপরদিকে, তুরস্ক থেকে বাংলাদেশ ৩৮০.৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য ও যানবাহন উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালে তুরস্কের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ৪২৭.৯৮ মিলিয়ন ডলারে, যা মূলত মহামারির পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ফল। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ তুরস্কে ৪৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যা আগের বছরের তুলনায় ২.৬৭% বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দুই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৭৪ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তুরস্ক বাংলাদেশ থেকে মোট ৬৩৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
রোহিঙ্গা সংকট: ওআইসি’র রোহিঙ্গা বিষয়ক যোগাযোগ গ্রুপের সহ-সভাপতি এবং ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে একযোগে কাজ করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীবিষয়ক সংকট মোকাবিলায় আঙ্কারার ভূমিকা বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে এক বিশ্বস্ত ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গঠনে সহায়তা করেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আঙ্কারা বহুপক্ষীয় কিছু কূটনৈতিক সংঘাতে জড়ায়। এ ছাড়া জাতিসংঘ, জি-২০, মিকতা; ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার একটি অনানুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব এবং অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) বাংলাদেশকে ও রোহিঙ্গাদের তাদের ন্যায্য দাবিগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে সহায়তা করেছিল।
সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবার পেছনে প্রধান কারণ উভয় দেশের জাতীয় স্বার্থ। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যার ফলাফল এ ধরনের সহযোগিতা। কোনো একটি দেশের কিংবা একটি ব্লকের ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশ ও ব্লকের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছে বাংলাদেশ। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে যেমন সামরিক সহযোগিতার চুক্তি আছে তেমনি তুরস্কের সঙ্গেও সন্ত্রাস দমনের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করবে বাংলাদেশ। এছাড়া ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রতি গুরুত্বের বিষয়টিও বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোর আগ্রহ তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশ-তুরস্কের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।