দেশের খুচরা বাজারে ঈদের পোশাকের বড় জোগানদাতা রাজধানীর বঙ্গবাজার। প্রধান বাজারটি পুড়ে গেলেও আশপাশের কয়েকটি বাজারও বঙ্গবাজার হিসেবে পরিচিত। এবারের ঈদে বিক্রি বৃদ্ধির আশা করলেও প্রত্যাশা মতো বিক্রি হচ্ছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মফস্বলের বাজারে প্রবাসী পরিবারগুলো সীমিত আকারে কেনাকাটা করছে বলে জানান তারা। তাই গতবারের তুলনায় বেচা বিক্রি খুব একটা বাড়েনি বলছেন তারা।
বঙ্গবাজারে পাইকারি দরে শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট ও মেয়েদের ওয়ান পিছ, টুপিছ এবং থ্রি-পিছ পাওয়া যায়। তা ছাড়া বাচ্চাদের পোশাক এবং কিছু পাঞ্জাবিও পাওয়া যায়। মূলত শবে বরাত থেকে ১৫-২০ রোজা পর্যন্ত পাইকারি বিক্রি বেশি হয়। শেষের ১০ দিন খুচরা বিক্রি করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।
বঙ্গবাজার ইসলামিয়া মার্কেটে দোকান আছে ৩৫০টির বেশি। এখানে দিনে গড়ে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হয়। এ মার্কেটের ব্যবস্থাপক হাসমত ব্যাপারী বলেন, এবার দিনে দেড় থেকে ২ কোটি টাকার কাপড় বিক্রির প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী বিক্রি কম। ৩০ শতাংশ দোকানে হয়তো বিক্রি ভালো। বাকিগুলোতে মোটামুটি বিক্রি চলছে।
কম বিক্রির কারণ জানতে চাইলে হাসমত ব্যাপারী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি কম। তাই পাইকারিতেও এটার প্রভাব পড়েছে।
এ মার্কেটের নিচ তলায় একটি পোশাক কারখানায় পাইকারি দামে শার্ট বিক্রি হয়। চায়না কাপড়ের শার্ট পাওয়া যায় ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। বিক্রয়কর্মী কবির হোসেন জানান, দিনে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। তবে রোজার শেষের দিকে পাইকারি বাজারের বিক্রি কমে যায় বলে জানান তিনি।
কেরানীগঞ্জ থেকে বাচ্চাকে নিয়ে বঙ্গবাজারে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ফরিদ মিয়া। তিনি বলেন, দাম তো বাইরের বিপনিবিতানের মতোই মনে হচ্ছে। আর এখন তারা খুচরা বিক্রি করতে চায় না। কিন্তু অন্য সময় তারা কাপড় নেওয়ার জন্য ডাকে।
এখানকার এনেক্সকো টাওয়ারের বিসমিল্লাহ গার্মেন্টসে নারীদের ওয়ান, টু ও থ্রি-পিছ বিক্রি করা হয়। ৪০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকায় এসব কাপড় কেনা যায়। বিক্রেতা তানভীর আহমেদ জানান, দিনে মাত্র ৫০ হাজার টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে। যদিও আগের ঈদেও বিক্রি ছিল লাখ টাকার ওপরে।
এ মার্কেটের আরিফ গার্মেন্টস নামের আরেক দোকানে শুধু বাচ্চাদের পোশাক বিক্রি করা হয়। লিলেন গেঞ্জি কাপড়ের এসব কাপড়ের পাইকারি দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা। ৩০০ টাকারও কিছু কাপড় রয়েছে। দিনে বিক্রি ৫০ হাজার টাকার নিচে। বিক্রেতা জহিরুল ইসলাম জানান, যুদ্ধের কারণে প্রবাসীরা আতংকিত। তারা কেনাকাটা শুরু করেননি, করবেন কি না, ওই সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না। সামনে কি হতে যাচ্ছে- সেই চিন্তা থেকে আগের মতো কাপড় কিনছে না তারা। তাই পাইকারি বিক্রি কমে গেছে।
এদিকে ২৬ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করত আবির ফ্যাশনের বিক্রি ভালোই। তারা শুধু জিনসের প্যান্ট বিক্রি করে। ৫ ভাইয়ের পারিবারিক ব্যবসা নিয়ে শাহিন ব্যাপারী বলেন, আমাদের গড় বিক্রি দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। এখানে ৩১০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার প্যান্ট পাওয়া যায়। অন্যদের তুলনায় বিক্রি বেশি থাকলেও গত ঈদের তুলনায় বিক্রি বেশি না বলে জানান এ উদ্যোক্তা।
এখানকার বঙ্গ হোমিও কমপ্লেক্সে ৮০টির বেশি দোকান রয়েছে। বরিশাল প্লাজায় আছে ১৮০টির বেশি দোকান। এসব মার্কেট নিয়েও বঙ্গবাজার গড়ে উঠেছে। মূল মার্কেট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। ৩ বছর আগে আগুনে পুড়ে যায় মার্কেটটি।
বরিশাল প্লাজার কয়েকটি দোকানে পাঞ্জাবি বিক্রি হয়। এ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে শাহাদাত পাঞ্জাবি। পুড়ে যাওয়া বঙ্গ বাজারে এ প্রতিষ্ঠানের ৪টি দোকান থাকলেও এখন একটি দোকান নিয়ে ব্যবসা চলছে ঢিমেতালে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক শামসুল আলম বলেন, ঈদের রেমিট্যান্স পাঠানো কমেছে। এটার প্রভাবে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি কমেছে। তাই নতুন করে কেউ আর মাল নিচ্ছে না। আগের মালই শেষ হচ্ছে না। সম্প্রতি এক পাইকার ৯ হাজার টাকার মাল ফেরত নিয়ে এসেছে। পরে বদলিয়ে কিছু মাল নিয়ে গেছে। ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় এখানে পাঞ্জাবি পাওয়া যাচ্ছে। গতবারের তুলনায় এবার বিক্রি অর্ধেক দাবি করছেন এ ব্যবসায়ী। দৈনিক বিক্রি নেমেছে ৫ হাজার টাকার নিচে।
রোজার শেষ ভাগ চলে আসায় এসব মার্কেটে পাইকারদের আগাগোনাও কমেছে। এদিকে নির্মাণাধীন বঙ্গ মার্কেটের ভবনের সামনে ছাতা বসিয়ে কয়েকটি অস্থায়ী দোকানে কম দামি কাপড় বিক্রি করছেন কয়েকজন। তাদের বিক্রিও কম বলে জানান মৌসুমি এসব পাইকাররা। পুড়ে যাওয়া মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ী আশপাশের দোকানে ছোট করে ব্যবসা করছেন। অনেকে আবার টিকতে না পেরে ব্যবসা ছেড়েছেন।
মিরপুরে জমজমাট ঈদ বাজার, ফুটপাতেও ভিড়
মিরপুর এলাকার বিভিন্ন বিপণিবিতান ও মার্কেটে জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা। ঈদ ঘনিয়ে আসায় সকাল থেকেই শপিংমল ও ফুটপাতে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। গতকাল সকালে মিরপুরের বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনেক ক্রেতার হাতেই ছিল একাধিক শপিংব্যাগ, চোখেমুখে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে সব দোকানে সমান ভিড় না থাকলেও বিকেলের পর ক্রেতা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
শপিংমলের বাইরে ফুটপাতেও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঈদ কেনাকাটায় সাধারণত প্রথমেই জামা-কাপড় কেনেন ক্রেতারা। শেষ সময়ে জামা-কাপড়ের সঙ্গে মিলিয়ে জুতা, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে দেখা যায়।
মিরপুরের একটি শপিং সেন্টারের চারতলায় বাচ্চাদের জন্য জুতা কিনতে এসেছিলেন শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, রোজার শুরুতেই দুই মেয়ের জামা কিনেছিলাম। আজ ছুটি পেয়ে তাদের জন্য জুতা কিনতে এসেছি। ভিড় এড়াতে সকালে চলে এসেছি, কারণ সন্ধ্যার পর এখানে পা ফেলার জায়গা থাকে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ততই ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে আজ ইফতারের পর থেকে বেচাকেনা বাড়বে বলে আশা করছি। চাঁদরাত পর্যন্ত বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছি।
মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ছেলেদের স্যান্ডেল ও কেডস এবং মেয়েদের হিল জুতার চাহিদা বেশি। ডিজাইন ও ব্র্যান্ডভেদে ছেলেদের স্যান্ডেল এবং কেডসের দাম ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের জুতার দাম ৮০০ থেকে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মিরপুরের শাহ আলী মার্কেটের নিচতলায় রয়েছে কয়েকটি জুতার দোকান। জুতা ব্যবসায়ী মোকাররম বলেন, এখন ক্রেতার চাপ বেশিই। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিক্রি আরও বেড়ে যায়। ছেলেদের লোফার ও কেডস ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এক দামে বিক্রি করায় ক্রেতারাও তেমন দরদাম করছেন না।
রোজার দিনে শপিংমলে ঘোরাঘুরি করা কষ্টকর হওয়ায় অনেকেই ভিড় এড়াতে সকালেই কেনাকাটা সেরে ফেলছেন। বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, নারী ক্রেতাদের মধ্যে সুতি ও আরামদায়ক সিল্কের থ্রি-পিসের চাহিদা বেশি। পাশাপাশি শাড়ি, টুপি ও নানা ধরনের পোশাকেও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, পাঞ্জাবির দোকানেও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে কসমেটিকস ও পুরুষদের বেল্টের দোকানেও ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
মিরপুর শপিং সেন্টারের পেলেস দোকানের কর্মচারী আকরাম জানান, পাঞ্জাবি, শার্ট ও প্যান্টের বিক্রি বেশি হচ্ছে। চাঁদরাত পর্যন্ত পাঞ্জাবি বিক্রি চলবে। ক্রেতাদের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন দামের পাঞ্জাবি রাখা হয়েছে।