- দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত রোববার
- বিয়ে বা উৎসব অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা যাবে না
- গাড়িতে ৩০ শতাংশ জ্বালানি কম নিতে হবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তনসহ একগুচ্ছ কৃচ্ছসাধন ও ব্যয় সংকোচনমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সব ধরণের অফিস শুরু হবে সকাল ৯টায়, এবং শেষ হবে বিকাল ৪টায়। এছাড়া সন্ধ্যা ৬টার পর সব বিপণিবিতান ও মার্কেট বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিন বৃদ্ধি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সশরীর ও অনলাইনে ক্লাস করাসহ বেশ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার চতুর্থ বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বৈঠকের বিস্তারিত জানান।
মন্ত্রী পরিষদ সচিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানির সাপ্লাই লাইন ইনসিকিউরড। অফিসের সময় ১ ঘণ্টা কমে সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৪টায় শেষ হবে। আর ব্যাংক চলবে ৯টা থেকে ৩টা পর্যন্ত। দোকানপাট ও বিপণিবিতানহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
নাসিমুল গনি জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আলাদা নির্দেশনা দেবে, যা আগামী রবিবার থেকে কার্যকর হতে পারে। এছাড়া স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট নিরসনে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইলেকট্রিক বাস আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেসব স্কুল এই উদ্যোগে অংশ নেবে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তবে, কোনও পুরোনো বাস আনা যাবে না ।
তিনি আরও জানান, সরকারের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বাজেট থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাস পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনও নতুন গাড়ি (সড়ক, নৌ বা আকাশযান) এবং কম্পিউটার সামগ্রী কেনা যাবে না। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের সকল বিদেশ ভ্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ৫০ শতাংশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন খরচও ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
এর আগে সকালে দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্য বিতান ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। তবে হোটেল, ফার্মেসি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সেবার দোকান, কাঁচাবাজার এর আওতাবহির্ভূত থাকবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, জ্বালানি সংকটের এই সময়ে কোনও ধরনের বেসরকারি বিয়ে বা উৎসব-অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা যাবে না।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুধু যানবাহনেই নয়, বরং সরকারি খাতের সার্বিক ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আরও বিস্তৃত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাতে নতুন করে গাড়ি, জলযান, আকাশযান এবং কম্পিউটার ক্রয় শতভাগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অন্যতম। এতে করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
এছাড়া সরকারি কার্যালয়গুলোতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে ৩০ শতাংশ কাটছাঁটের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় সরকারি ভবনগুলোর শোভাবর্ধন ব্যয়েও বড় ধরনের কাটছাঁট আনা হয়েছে। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে এ ব্যয় ২০ শতাংশ এবং অনাবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কমানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে আরও জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নতুন কোনো ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে না, যাতে করে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান সংঘাতে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে প্রভাব; পরিস্থিতি মোকাবিলায় গৃহীত কর্মকৌশল (স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি); অর্থায়ন কৌশল-সংবলিত অর্থ বিভাগের প্রণীত কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিদ্যমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রণীত সমন্বিত কর্মকৌশলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান, সারের উৎপাদন, মজুত ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিতকরণ এবং শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার স্বার্থে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, আগামী ৩ মাস দেশব্যাপী সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গৃহীত কর্মকৌশল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা, ব্যাংকিং সেবা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জরুরিসেবা ছাড়া সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে। সরকারের পরিচালন ব্যয় কমাতে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা তাদের সরকারি কার্যক্রমে গাড়ির জন্য মাসিক বরাদ্দ করা জ্বালানির ৩০ শতাংশ কম নেবেন।
এতে আরও বলা হয়, সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দ করা জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। সরকারি কার্যালয়ে জ্বালানি/বিদ্যুৎ/গ্যাস ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। আবাসিক ভবন শোভাবর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ এবং অনাবাসিক ভবন শোভাবর্ধন ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণ আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।