জ্বালানি তেলের জন্য রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হলেও সরকার কেন এই সমস্যাটি এড়িয়ে যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি এই প্রশ্ন রাখেন।
সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি গ্রাজুয়ালি পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজকে সিলেটের পাম্প বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমরা দেখছি যে, রাস্তায় লাইনের গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং আমরা বারবার করে দেখতে পাচ্ছি যে সবাই প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় সরকার এ বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।’
মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রী এই প্রবলেমটি একনলেজ করার পরিবর্তে মন্ত্রী আগের মতো আমরা সমস্যা এভয়েড করে যেতাম। মন্ত্রীদের মধ্যে এই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’ হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন রাখেন, ‘উনি কি দেখতে পাচ্ছেন না, গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং গ্রেজুয়ালি যে পাম্পগুলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে, স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেই জায়গাতে উনি কবে নাগাদ এই সমস্যা যথাযথভাবে সমাধান দেবেন এবং উনি প্রবলেমটি একনলেজ করবেন কি না?’
জবাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রতিটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন দেওয়ার কথা সেই পরিমাণ তেল আমাদের পাম্পগুলোতে সাপ্লাই করা হচ্ছে। কিন্তু ইরান ঘটনার পর থেকে হঠাৎ করে বৃদ্ধি বেড়ে গেছে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ফলে যে পেট্রোল পাম্পে যে পরিমাণে তেল দিতাম, এক দিন দেড় দিন লাগত বিক্রি করতে, এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। সেই জন্য মানুষের যে প্যানিক শুরু হয়েছে, লাইন দেখা যায়। কিন্তু পেট্রোল সাপ্লাই হয় না এটা ঠিক না। পেট্রোল প্রতিদিন সাপ্লাই করা হয়।’
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশে যে গ্যাস সঞ্চালন লাইন আছে, অনেক পুরোনো এবং গ্যাসের উত্তোলনের কমের জন্য চাপ কমে গেছে। সেজন্য প্রেসার কম থাকে। সেজন্য মাঝে মাঝে গ্যাসের লাইনে যায় না। আমরা একটা প্রকল্প নিয়েছি, প্রকল্পটা বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে।’
তেল না পেয়ে এমপিরাও সংকটে, মজুতদার ডিলারদের ধরতে পুলিশ ডাকার পরামর্শ মন্ত্রীর
জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে সংসদ সদস্যদের (এমপি) অসম্মানিত হওয়া ও সংকটে পড়ার বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। একইসঙ্গে তার এলাকায় ডিলারদের কারসাজি করে বাড়িতে লুকিয়ে তেল বিক্রির অভিযোগও তোলেন তিনি।
জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ডিলাররা লুকিয়ে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্যে তাদের ধরে এনে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধ রাখার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে গোটা বিশ্বই এখন সাশ্রয়ী হচ্ছে।
সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘গতকালই দেখলাম আমাদের একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছুটা অসম্মানিত হয়েছেন। এর আগে আরেকজন সংসদ সদস্য তেল না পেয়ে সংকটে পড়েছিলেন। আমরা ছোটখাটো জনপ্রতিনিধি, দিনে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টা ফোন পাচ্ছি। আমার এলাকা বাউফলে পেট্রল পাম্প না থাকায় ডিলাররা কারসাজি করছেন। তারা দোকান বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের বাড়িতে তেল বিক্রি করছেন। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট গেলে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে তিনি আরও বলেন, ‘আজকে মন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তার সঙ্গে আমাদের এলাকার পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। রাত ৮টার মধ্যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে বলা হচ্ছে। আমার এলাকা বাউফলে জ্বালানি সংকটে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা উত্তরণে মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?’
জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের যে মজুত আছে এবং যে এলাকায় প্রতিদিন যতটুকু তেল দেওয়ার কথা, আমরা তা সরবরাহ করছি। সংসদ সদস্য নিজেই বললেন, ডিলাররা ইচ্ছে করে পালিয়ে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানালে তারা ওই ডিলারকে ধরে এনে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে।’
বর্তমান পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক সমস্যা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই এটি এখন খুব বড় সমস্যা। তারপরও আমরা বাংলাদেশে এটা সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু মানুষের মধ্যে যদি প্যানিক বায়িং (আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা) সৃষ্টি হয়, তবে তা রোধ করা কঠিন। আমরা মানুষের কাছে আবেদন করছি, আপনাদের যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই কিনুন। এটি করলে জ্বালানি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।’
রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনার বিষয়ে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই এখন সবাই সাশ্রয়ী হয়েছে। আমরা তো পৃথিবীর বাইরে নই। তাই আমরাও সাশ্রয় করার জন্য জনগণকে অনুরোধ করছি। আশা করি জনগণ আমাদের এই অনুরোধ রক্ষা করবেন।’
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ ঘাটতি নেই
দেশে বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তবে গ্রীষ্মকালে জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সময় প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। ফলে তখন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয় না।
লোডশেডিং কমাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সঞ্চালন ও বিতরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে নেওয়া পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহারে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-এসি’র তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং ব্যবহার শেষে সুইচ বন্ধ করা।
এছাড়া পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে পানির পাম্প, ওভেন, হিটার, ইস্ত্রি, ওয়াশিং মেশিন ও ওয়েল্ডিং মেশিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। শপিংমলে অতিরিক্ত আলো ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ভিজিল্যান্স টিম কাজ করছে।
মন্ত্রী আরও জানান, অটোচার্জিং স্টেশনগুলোকে পিক আওয়ারে চার্জিং বন্ধ রাখতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে
দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবুর এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী এ কথা জানান। তিনি জানান, দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশীয় উৎস হতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিকল্পে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী ১ বছরে মোট ১১৭টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে পেট্রোবাংলা কর্তৃক গৃহীত অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রমের অগ্রগতি ও গ্যাস মজুদ সংক্রান্ত তথ্যাদি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২০২২ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৫টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দৈনিক ২৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬: উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির আওতায় স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ ও ‘অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সম্ভাব্য নতুন গ্যাস মজুদ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, পেট্রোবাংলা কর্তৃক গৃহীত কর্মপরিকল্পনার আওতায় সব কূপ খনন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলে আনুমানিক ১,৫৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে।