ইস্ট লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল রোডের ব্যস্ততা আর কাসাব্লাঙ্কা ক্যাফের আড্ডায় এখন কেবল একটিই সুর-১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন’। সুদূর ব্রিটেনের মাটিতে বসেও কয়েক হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের ভাগ্যনির্ধারণী এই নির্বাচন নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে, তা গত দুই দশকে নজিরবিহীন। আল-জাজিরার সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা প্রথমবারের মতো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে আবেগপ্রবণ ও একইসঙ্গে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার: একটি ঐতিহাসিক মোড়

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এটিই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑবিদেশে থাকা প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশির প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার লাভ। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখের বেশি প্রবাসী নিবন্ধন করলেও কেবল যুক্তরাজ্যেই নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে বসবাসরত ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী খালেদ নূর বলেন, “বছরের পর বছর আমরা এই মুহূর্তের জন্য আন্দোলন করেছি। মানুষ স্বীকৃতি চেয়েছিল। এখন নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার পর থেকে এটিই আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।”

নির্বাচনী সমীকরণ ও প্রবাসীদের প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রবাসী ভোটাররা ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারেন। কিছু নির্বাচনী আসনে প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে এই বিপুল পরিমাণ ভোট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল পাল্টে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী লন্ডনে বসবাস করায় ওই অঞ্চলের আসনগুলোতে প্রবাসীদের প্রভাব হবে আকাশচুম্বী।

প্রজন্মের বিভাজন: আবেগ বনাম বাস্তবতা

লন্ডনের প্রবাসীদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে একটি স্পষ্ট প্রজন্মের বিভাজন দেখা যাচ্ছে। প্রবীণ প্রজন্ম, যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বা নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন দেখেছেন, তারা দেশের রাজনীতির সঙ্গে মানসিকভাবে গভীরভাবে জড়িত। ৫৮ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের মতো অনেকে ডাকযোগে ব্যালট পাঠাতে পেরে উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, “আমি ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম ভোট দিচ্ছি। আমার চার সন্তান বাংলাদেশে থাকে, আমি তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দেশ চাই।”

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। হোয়াইটচ্যাপেল মার্কেটে আসা রাদওয়ান আহমেদের মতো অনেক তরুণের মতে, ব্রিটিশ রাজনীতিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে বাংলাদেশের রাজনীতি এক জটিল ও ধোঁয়াশাপূর্ণ বিষয়।

জটিলতা ও প্রযুক্তির বাধা

ভোটাধিকার পেলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক প্রবাসীকে নিরুৎসাহিত করেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ, হাই-কমিশনে বায়োমেট্রিক প্রদান এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি বয়স্ক ভোটারদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। ৪৪ বছর বয়সি কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক মিজানুর খান জানান, সচেতনতার অভাবে এবং নিবন্ধনের সময়সীমা মিস করায় তিনি ভোট দিতে পারেননি। অনেকে আবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে মত প্রকাশে সাবধানী থাকছেন।

লন্ডন: বাংলাদেশের রাজনীতির অঘোষিত কেন্দ্র

বাংলাদেশের রাজনীতির দুই বিপরীত ধারার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতিও লন্ডনের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের লন্ডন বাস এক পক্ষের কাছে অনুপ্রেরণা হলেও অন্য পক্ষের কাছে তা সমালোচনার বিষয়। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার ভাতিজি ও লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতে কারাদণ্ডের রায় প্রবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। এমনকি টাওয়ার হ্যামলেটসের কয়েকজন স্থানীয় কাউন্সিলর বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় ‘দ্বৈত আনুগত্য’ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে।

ইশতেহার ও নতুন শক্তির উত্থান

এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের বড় একটি অংশ গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জোটকে। ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গঠিত এনসিপি এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির জামায়াত মিলে যে ‘বিকল্প রাষ্ট্রদর্শন’ বা ‘জনতার ইশতেহার’ তুলে ধরেছে, তা প্রবাসীদের মধ্যে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন হোয়াইটচ্যাপেল থেকে ক্যানারি ওয়ার্ফ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেবল রেমিট্যান্স যোদ্ধা নন, বরং তারা এখন দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে চলেছেন। তাদের পাঠানো ব্যালটগুলো কি দেশে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও পরিবর্তন আনতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে। তবে আপাতত ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের বার্তা পরিষ্কারÑতারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চান।