• ভরা মৌসুমে ধান কাটতে না পারায় কৃষকদের মাথায় হাত
  • ডিজেল না পেয়ে মন্ত্রীকে ফোন প্রান্তিক কৃষকের

ভয়াবহ জ¦ালানি সংকটে দুচোখে অন্ধকার দেখছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখ লাখ প্রান্তিক কৃষক। ডিজেল নেই পাম্পে, থাকলেও মেলে না চাহিদামতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফিরছেন অনেকে। জ্বালানি না পেয়ে সেচ বন্ধ।

যে সময় কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা, সেই সময়ে তাঁদের উপর চেপে বসেছে দুশ্চিন্তা। ডিজেল না পেয়ে কৃষিমন্ত্রীকে প্রান্তিক কৃষকদের ফোন দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তীব্র জ্বালানি সংকটে এবার সরাসরি আঘাত পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষি খাতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,সেচযন্ত্রের বড় অংশ চলে ডিজেলে। বাকি অংশ চলে বিদ্যুতে। আবার ধান, গম ও ভুট্টা খেত থেকে সংগ্রহের জন্য এখন কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। মাড়াইয়ের কাজেও লাগে কৃষিযন্ত্র। এসব যন্ত্র চলে মূলত ডিজেল দিয়ে। কিছু চলে পেট্রল দিয়ে। কৃষিযন্ত্র পরিচালনাকারীরা প্রয়োজনমতো জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।

কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনমতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচে যেমন সংকট তৈরি হচ্ছে, তেমনি ফসল কাটা নিয়েও কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন। বোরো মৌসুমের ধান কাটা কিছুদিন পরেই শুরু হবে। তখন প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল না পেলে সংকট তৈরি হবে। বিশেষ করে হাওরে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত ধান কেটে ফেলা জরুরি, যাতে আগাম পানি চলে এলে ফসলের ক্ষতি না হয়।

ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু গতকাল শনিবার বলেছেন, কৃষকদের ধান সংগ্রহকালে ডিজেল ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। জ্বালানি কারণে হাওড়ে ধান ঘরে তুলতে যাতে কোন সমস্যা না হয়। কৃষক যেন বাঁচে, ধান যেন বাঁচে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বলছে, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষি সেচ মৌসুম। দেশে ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্রের সংখ্যা ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯। এর মধ্যে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি (পাম্প), পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, ফসল মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্র ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র রয়েছে।

ডিএইর হিসাবে, কম্বাইন্ড হারভেস্ট ফসল কেটে মাড়াই করে বস্তায় ভরে দেয়। এর সংখ্যা ১০ হাজার ৭২৬। ফসল মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য যন্ত্র আছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি।

ডিএইর হিসাবে, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষি সেচ মৌসুমে সেচ ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা থাকে সাড়ে ১২ লাখ টনের মতো।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এ সময়টাতে বৃষ্টি হলে সেচের প্রয়োজন কম হয়। দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছে। এতে আলু, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসলের চাষিরা কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে ধানসহ কিছু ফসলে সেচের চাহিদা কমেছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) হিসাবে, ছয় মাসের সেচ মৌসুমে শুধু সেচযন্ত্রে জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন।

জানা গেছে, কৃষকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজারের বিক্রেতাদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করেন। এই সব বিক্রেতার সাধারণত লাইসেন্স থাকে না। দেশজুড়ে অভিযানে যেমন মজুত করা তেল ধরা পড়ছে, তেমনি জরিমানার ভয়ে অনেক বিক্রেতা তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়ছে কৃষিতে।

কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো বলছে, দেশে বর্তমানে মোট আবাদ করা জমির ১৫ শতাংশের ধান কাটা হয় হারভেস্টর দিয়ে, যা ডিজেল দিয়ে চলে। অন্যদিকে ধান কাটার যন্ত্র রিপার চলে পেট্রল দিয়ে। ধান ঝাড়াই করার থ্রেশার চলে ডিজেল দিয়ে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সেলিম রায়হান মনে করেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। এটা খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়। তিনি বলেন, কৃষি খাতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করতে হবে এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের সহায়তা করতে হবে।

কয়েকটি জেলার চিত্র:

বোরো ধানের ভরা মৌসুমে মাথায় হাত কৃষকের। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীলতার জেরে দেশে দেখা দিয়েছে জ¦ালানি সংকট। যদি ও সরকার বারবার বলছে, কোন সংকট নেই। রংপুর, পাবনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার প্রান্তিক কৃষকদের খোজ নিয়ে জানা গেছে তারা জ¦ালানি সংকটের কারনে সেচসহ ধান কাটা নিয়ে সংকটে পড়েছেন।

জানা গেছে, রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় এবার ৫ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপ ৯৬ হাজারের বেশি। জ্বালানি সংকটে সেচে এবার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে ২৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

হাড়িয়ারকুঠির কাশিয়াবাড়ি গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, দুইটা তেল পাম্প ঘুরে শেষে তিন নম্বর পাম্পে এসে দুই লিটার ডিজেল পেলাম। ২০০ টাকার ডিজেল নিতে আমার যাতায়াত খরচ ১২০ টাকা। এই তেলে চার ঘণ্টা মেশিন চলবে না। এবার যে ধানের কী হবে, আল্লাহ ভালো জানেন।’

গঙ্গাচড়ায় কয়েক হাজার একর জমিতে সেচের জন্য প্রতিদিন প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না।

কোলকোন্দ ইউনিয়নের চেংডো এলাকার কৃষক শাহিন বলেন, ‘তিস্তার চরে ৬ একর জমিতে ভুট্টা লাগাইছি। প্রতি সপ্তাহে পানি দিতে ৬-৭ লিটার পেট্রল লাগে। কিন্তু জেরিকেনে (প্লাস্টিকের তেলের জার) তেল দেয় না। তাই চার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পাম্প নিয়ে আসতে হয়। এত কষ্ট করে আসার পর সাত লিটার দরকার থাকলেও দিল মাত্র ৩ লিটার।’

পাবনার চাটমোহর উপজেলায়ও একই চিত্র। কৃষকেরা শ্যালো মেশিন, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার চালাতে ডিজেল পাচ্ছেন না। ক্যানে তেল দেওয়া বন্ধ থাকায় পাম্পে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

গুনাইগাছা গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমাদের মাঠে ২০০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য শ্যালো ইঞ্জিন চালিত গভীর নলকূপ আছে। এক ফসল উৎপাদনে ৮ থেকে ৯ ব্যারেল ডিজেল লাগে। কিন্তু এবার তেল সংকটের কারণে সেচ বন্ধ রাখা রয়েছে। অনেকে ধানের আবাদ না করে পাট ও তিল বুনেছে। এতে কৃষকের লোকসান হবে।’

ফরিদপুরে চলতি মৌসুমে ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে পাট, ২৩ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান, ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে তিল এবং ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন হলেও ডিজেলের সংকটে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা।

নগরকান্দার আমিরুল মোল্লাা বলেন, পাটে পানি দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, ঠিকমতো তেল পাচ্ছি না। পাম্পে গেলে বলে তেল নাই; দোকান থেকে কিনলে ১৫০ টাকা লিটার, তা-ও ৫ লিটারের বেশি দিচ্ছে না। এই রোদে পাটে ঠিকমতো পানি না দিতে পারলে গাছ মরে যাবে।’

কুষ্টিয়ায় কৃষক আশরাফুল আলম বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে সেচ দিতে প্রায় ২ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। আমার ১৩ বিঘা জমির মধ্যে ৮ বিঘায় ধান। কিন্তু দিনে মাত্র ৩ লিটার করে ডিজেল পাচ্ছি। এক দিন পরপর ১৯ লিটার লাগে, পাচ্ছি মাত্র ৬ লিটার।

গাইবান্ধার এনামুল হোসেন বলেন, ‘আমি পাঁচ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করছি। তেলের জন্য তিন-চার দিন থেকে ঘুরছি। কোথায় পাই নাই।’

ঝিনাইদহের মিঠুন দাস বলেন, ‘সকাল ৬টা থেকে আমি লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন বেলা ১১টা বাজে। এসে শুনছি তেল শেষ হয়ে গেছে।’

রাজশাহীর চরাঞ্চলে পদ্মা নদী পার হয়ে তেল আনতে হচ্ছে। পুঠিয়ার মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আগে গ্রামের বাজারেই ডিজেল পেতাম। এখন ১০ কিলোমিটার দূরে পাম্প থেকে তেল আনতে হয়। লম্বা লাইন ধরে তা-ও ৫ লিটার তেল দেয়।’ গোপালগঞ্জের রহমত মিয়া বলেন, ‘এখন বোরো ধানে থোড় আশার সময়। এই সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত সেচ না দিতে পারলে ধান পুষ্ট হবে না।’

বিভিন্ন জেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং স্লিপ দেওয়ার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকেরা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কৃষকেরা চান, যথাসময়ে যেন তাঁদের পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হয়। অন্যথায় ভরা মৌসুমে ফসল হারিয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাঁদের।

৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে বন্দরে ভিড়ছে জাহাজ:

মালয়েশিয়া থেকে ৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামের বন্দরে এসে পৌঁছেছে চীনের পতাকাবাহী ‘শান গ্যাং ফা জিয়ান’ নামের একটি জাহাজ। গতকাল শনিবার, সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, জাহাজটি শুক্রবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে, বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে পৌঁছেছে। জাহাজটি গত ২৯ মার্চ মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। এর স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইনস।

এর আগে, শুক্রবার দুপুর ২টায় সিঙ্গাপুর থেকে আসা ‘ইয়ান জিং হে’ নামের আরেকটি জাহাজ ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে পদ্মা অয়েলের ডলফিন জেটি-৬-এ খালাস কার্যক্রম শুরু করেছে। এটি রোববার বন্দর ত্যাগ করবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো দশম ডিজেল জাহাজ। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পাইপলাইনে থাকা সরবরাহের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি

কৃষিমন্ত্রীকে প্রান্তিক কৃষকের ফোন :

পাবনার ঈশ্বরদীতে কৃষিযন্ত্র চালানোর জন্য ডিজেল সংকটের কার্যকর সমাধান না পেয়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক মো. ময়েজ উদ্দিন (কুল ময়েজ) কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে ফোন করেন। মন্ত্রী তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

কৃষক ময়েজ উদ্দিন জানান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কয়েক দিন ধরে কৃষকদের জন্য স্লিপ (চিরকুট) দিচ্ছেন কিন্তু সেই স্লিপ দেখিয়েও ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পুরো দেশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল কিন্তু কৃষকদের কোনো তালিকা বা পরিচয়পত্র নেই। এ কারণে আমরা বারবার হয়রানির শিকার হচ্ছি।