প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বলেছেন, আমার সম্মানিত পূর্বসূরি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের প্রণীত রোডম্যাপের ওপর ভিত্তি করে, প্রযোজন অনুসারে কিছু পরিবর্তন ও পরিমার্জনসহ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। মামলা জট কমানো এবং বিচারপতি, আইনজীবী ও বিপুল সংখ্যক ন্যায়বিচার প্রার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

গতকাল রোববার আপিল বিভাগের এজলাসে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও আইনজীবী সমিতির পক্ষে সংবর্ধনা দেওয়ার জবাবে বক্তব্যে এ পদক্ষেপেরে কথা জানান প্রধান বিচারপতি।

প্রথমে আপিল বিভাগের এজলাসে নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়েরে পক্ষে দেওয়া সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সংবর্ধনা জানিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন । আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতি ও আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। সংবধনা অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট উভয় বিভাগের বিচারপতি,অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বার ভুইয়া ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনিক আর হক, অ্যাটর্নি কার্যালয়ের ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তারা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই শহীদ এবং বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করা হয়।

সচিবালয় গঠনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার দিকে যাত্রা শুরুর বিষয় উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি বিচার বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখবে এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করি, বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে। আমি অবশ্যই আশা করি, আমার সম্মানিত পূর্বসূরি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের প্রণীত রোডম্যাপের ওপর ভিত্তি করে, প্রযোজন অনুসারে কিছু পরিবর্তন ও পরিমার্জনসহ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। আমি মামলা জট কমাতে এবং বিচারপতি, আইনজীবী এবং বিপুল সংখ্যক ন্যায়বিচার প্রার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চাই।

প্রধান বিচারপতি আইনজীবীদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, আমরা সবাই মিলে এই দেশকে বসবাসের জন্য একটি উত্তম স্থানে পরিণত করার জন্য চেষ্টা করি যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শান্তি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে। আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে এই দেশের কল্যাণ কামনা করি সবার জন্য একতা ও সমৃদ্ধি প্রার্থনা করি।

বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক

দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল : দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল

অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, বিগত পনের বছরে দেশের বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সর্বশেষ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল আদালত। কিন্তু বিগত স্বৈরশাসনের সময়ে সেখানে নির্যাতিত অসহায় মানুষের ঠাঁই হয়নি। তখন সুবিচারের পরিবর্তে অবিচারই প্রাধান্য পেয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, বিগত পনের বছরে বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়েছিল। বিচার বিভাগ অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন হাতিয়ার। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, তখন বিচারপ্রার্থী, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের আহাজারি আদালতের মনে আঁচর কাটতে পারেনি। ফলে বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। নারী, পুরুষ ও শিশুদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিচার বিভাগ সেই অত্যাচারিত মানুষের পাশে ন্যায়ের ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতা আমাদের সকলের। তখন বিচার বিভাগের রন্দ্রে রন্দ্রে দুর্নীতির সয়লাব বয়ে গিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, সেই সময়ে বিচারের কারণ-বিহীন দীর্ঘসূত্রতা ও উদ্দেশ্যমূলক অতি দ্রুত বিচার দু’টোই বিচার বিভাগকে আশংকায় ফেলে দিয়েছিল। বিচার বিভাগ তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে বিচার বিভাগ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশার কবর রচিত হয়েছিল।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের পর এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। বিচার বিভাগ তার হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পায়। সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সুদৃঢ় ও ঐকান্তিক উদ্যোগে ও প্রাক্তণ অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সহযোগিতায় এবং বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায়, ‘মাসদার হোসেন মামলা’র রায়ের নির্দেশনার আলোকে অতি সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত হয় একটি ‘স্বাধীন সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়’।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল দুর্নীতি। দুর্নীতির এই বিষবাষ্প বিচারকার্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আক্রান্ত করেছে।

তিনি বলেন, জাতি প্রত্যাশা করে, বিচার বিভাগ সিন্ডিকেট মুক্ত হোক, দুর্নীতিমুক্ত হোক। দুর্নীতির প্রচলিত ধারণায় অর্থনৈতিক লেনদেনকে বুঝালেও, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ডিনামাইটের চেয়েও ধ্বংসাত্মক, অ্যাটম বোমার চেয়েও ভয়াবহ, ক্যানসারের চেয়েও মরণঘাতী। সুতরাং শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের সকল স্তর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। আর রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের নিরীক্ষক বিচার বিভাগ। যখন অন্য দুই অঙ্গ এড়িয়ে যায়, ভুল করে, অন্যায় বা অবৈধ কোন কিছু করে, তখন বিচার বিভাগ সাড়া দেয়, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে বলেন, আদালতের মামলা জট কমাতে হলে মিথ্যা মামলা দায়ের বন্ধ করতে হবে।বিচার বিভাগকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। সিন্ডিকেট মুক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিচার বিভাগের প্রতি নতুন প্রজন্ম এবং গণমানুষের যে আশা আকাক্সক্ষা রয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটানো অত্যাবশ্যক।

তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি আপনি বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করবেন। নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা দূর করবেন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। সমাজের সব স্তরে বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবেন। গত ১৬ বছরের গুম, হত্যা, মিথ্যা মামলার ব্যাপারে আপনি আমলে আনবেন।

তিনি প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে আরও বলেন, বিচার বিভাগের যে কোনো সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুনভাবে দেশ গড়ার প্রত্যয় ও বিচার বিভাগকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ হাঁটছে, সেই যাত্রায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিকে সব সময় আপনার পাশে পাবেন।

এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর সকালে বঙ্গভবনে প্রধান বিচারপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শপথ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ, উপদেষ্টাবৃন্দ , প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।