মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালীর ভেতরে পারস্য উপসাগরে ৪০ দিন ধরে আটকা পড়েছিল বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। গত বুধবার ভোরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির পর আটকে থাকা জাহাজটি হরমুজ পার হওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করে। তবে গত বৃহস্পতিবার রাতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সুযোগে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করলেও জাহাজটির নাবিকেরা ইরানীর বাহিনীর কাছে পার হওয়ার অনুমতি চেয়ে পাননি। হরমুজ প্রণালী থেকে ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করে রাখা এমভি বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি, শেষ পর্যন্ত অনুমতি না দিলে আরব আমিরাতের শারজাহ ফেরত যাওয়ার কথা জানায় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল এখনো স্থবির হয়ে আছে। গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সংঘাত থামানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও শিপ ট্র্যাকিং ডেটা থেকে জানা যায়, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে নামমাত্র কয়েকটি জাহাজ পারাপার হয়েছে। ফলে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার যে আশা দেখা দিয়েছিল, তা আপাতত ফিকে হতে শুরু করেছে।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলার জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত। অথচ বুধবার (৮ এপ্রিল) মাত্র পাঁচটি এবং বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সাতটি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে অন্তত ৩২৫টি ট্যাঙ্কারসহ মোট ৬০০টিরও বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, বীমা ঝুঁকি এবং নিরাপত্তার অভাবে জাহাজ মালিকরা এখনো এই পথ ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে সমুদ্রসীমায় মাইন পেতে রাখার আশঙ্কায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান এখন একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরান নিরাপদ যাতায়াতের চুক্তি মানছে না এবং তারা অত্যন্ত সম্মানহানিকর কাজ করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাল্টা অভিযোগে বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করছে না। তিনি লেবাননে ইসরাইলী হামলার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, বিশ্ব এখন দেখছে বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে এবং তারা পরিস্থিতি শান্ত করতে কতটা আন্তরিক। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিশ্ববাজারে। ফলে বিশ্ব বাজারে আবারও তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজের নাবিকেরা জানান, অনুমতি না পেয়ে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এসে নোঙর করে রাখা হয়েছে জাহাজটি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজটিতে বাংলাদেশের ৩১ জন নাবিক রয়েছেন। জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান গতকাল শুক্রবার বিকেলে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ থেকে ৬০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে পৌঁছানোর পর আমরা বেতারবার্তায় ইরানের বাহিনীর কাছে অনুমতি চাই। তারা অনুমতি দেয়নি। অনুমতি না পাওয়ার পর ৩০ নটিক্যাল মাইল সামনে গিয়ে নোঙর ফেলি, যাতে অনুমতি দেওয়ার তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করা যায়। রাশেদুল হাসান বলেন, ‘নোঙর যেখানে ফেলা হয়েছে, তা পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমা। আমাদের কাছাকাছি অনেক জাহাজ রয়েছে, সবাই হরমুজ প্রণালী নিরাপদে পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।’

গত বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে হরমুজের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল লাল-সবুজের পতাকাবাহী জাহাজটি। প্রায় ৪০ ঘণ্টা জাহাজ চালিয়ে হরমুজের কাছাকাছি পৌঁছার পর অনুমতির আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ইরানের আইজিআরসি। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, প্রাথমিকভাবে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি হরমুজ চ্যানেল পার হওয়ার অনুমতি পায়নি। আমরা কূটনৈতিকভাবে অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করি পেয়ে যাব। বর্তমানে আমাদের নাবিকদের নিয়ে জাহাজ নিরাপদ অবস্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।

এর আগে তিনি বলেছিলেন, আমাদের জাহাজ সৌদি আরবে অপেক্ষমাণ থাকলেও আমরা প্রতিদিন ভাড়া পেয়েছি। জাহাজে থাকা নাবিকের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের মজুত আছে। জাহাজটি প্রতিদিন ১৮ টন সামুদ্রিক পানি পরিশোধন করতে পারে। তবে এর জন্য ইঞ্জিন পুরোদমে চালু রাখতে হয়। রেশনিং করে পানির ব্যবহার দৈনিক ৬ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নাবিকদের মনোবল শক্ত রাখার জন্য আমরা ইতোমধ্যে দৈনিক খাবারের বরাদ্দ জনপ্রতি ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করেছি। এ ছাড়া বেসিকের সমপরিমাণ ওয়ার অ্যালাউন্স দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত রসদ ও জ্বালানি রয়েছে জাহাজে।

সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালী খুলে দিলেও ৪০ দিনে কয়েকশ’ জাহাজের জট লেগে গেছে। এ ছাড়া ইরানী কর্তৃপক্ষ দিনে কতটি জাহাজ হরমুজ পার হবে তা-ও নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

বিএসসি সূত্র জানায়, বাংলাদেশী ৩১ জন নাবিক প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে রাস আল খাইর বন্দর থেকে নতুন গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছেন। তবে তাদের গন্তব্য হতো চার্টারারের ডিমান্ত অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক বা ব্রাজিলের যেকোনো একটি বন্দর। ভারত থেকে পণ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে ঢুকেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে যায় জাহাজটি। এর পরদিনই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। এ সময় জাহাজটির খুব কাছেই একটি মিসাইল বা ড্রোন আঘাত হানে। তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নাবিকদের মধ্যে। গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে জাহাজের পণ্য খালাস শেষ হয়। এরপর কুয়েতের একটি বন্দরে পণ্য বোঝাই করার শিডিউল ছিল। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদে জাহাজটি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি। সে অনুযায়ী জাহাজটি হরমুজ প্রণালীর দিকে যাত্রা শুরু করলেও ঝুঁকির কারণে আগের জায়গায় নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেয়।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিন ট্রাফিকের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, যুদ্ধবিরতির পর বুধবার থেকে প্রণালীটি দিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক জাহাজ চলাচল করেছে। তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও লেবাননে ইসরাইলী হামলা চালায়। এরপর প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও নিয়ন্ত্রণ করে ইরান।

বিএসসির এই জাহাজ ২ এপ্রিল থেকে পারস্য উপসাগরে রয়েছে। সেখানে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ছিল। গত ১১ মার্চ জাহাজটি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএসসি। তবে সেবারও অনুমতি না পেয়ে হরমুজ পার হওয়া যায়নি। অনুমতি না পেয়ে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করা হয় জাহাজটিতে। এই সার নেওয়া হবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দরে। তবে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর দ্বিতীয় দফায়ও অনুমতি পেল না জাহাজটি।

উল্লেখ্য যে, যুদ্ধবিরতির খবরে তেলের দাম শুরুতে কিছুটা কমলেও, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় তা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনক-এর সিইও সুলতান আহমেদ আল জাবের স্পষ্ট করে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালি আসলে এখনো উন্মুক্ত হয়নি, বরং ইরান একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৬ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল হওয়ার আগে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজের নিয়মিত ও স্থিতিশীল চলাচল নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সূত্র: আলজাজিরা, আবর নিউজ, তেহরান টাইমস, খালিজ টাইমস।