সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তিকালের চতুর্থদিনেও শোক চলছে। এর মধ্যে বেগম জিয়ার অনেক সত্য এবং বাস্তব কথা ঘুরে- ফিরে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এগুলো একদিকে যেমন ধ্রূব সত্য এবং বাস্তব তেমনি রাজনীতিবিদদের জন্য আগামী দিনে চলার পাথেয়। কারো কারো কাছে কথা গুলো খারাপ লাগলেও প্রশংসা এবং বাহবা পাচ্ছে সব মহলে।
আওয়ামী লীগ যখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে রাজাকার বলে স্টিগমা দিয়ে অত্যাচার নির্যাতন করছিল; তখন বেগম জিয়া নির্ভয়ে ফ্যাসীবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন--- এখন জামায়াতে ইসলাম রাজাকার, খারাপ। তখন কিন্তু নিজামীর সাহেবের সাথে ফটোগুলো আছে মিটিং টিটিং এর। মওদুদ সাহেব স্ক্ষাী আছে(ব্যারিস্টার মওদুদ)। সেই ছবিগুলো দেখেন। তখন ব্যারিস্টার মওদুদ পাশ থেকে বলেন-- ছবিগুলো আমি-ই তুলিয়েছিলাম। হাস্য রসাত্মকভাবে আপনি বলেছিলেন হয়তো মাইন্ডসেট করে রেখেছিলেন যে বিএনপিতে আসবেন সেজন্য। একটা রেকর্ড রেখেছিলেন। আপনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেটার আমি নিন্দা করি। এবং তাদের একটা ইয়াং ছেলে শিবিরের সভাপতির ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে, এর তীব্র নিন্দা করি আমি। তীব্র নিন্দা করে প্রতিবাদ জানাই। কোন মানুষের সঙ্গে এমন কাজ হতে পারে না।’
তিনি নিজের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সিনিয়র নেতাদের উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘নেতাদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে--- নেতারা যার যার এলাকায় কমিটি করবেন। তাদের নিয়ে বসেন। দয়া করে পকেট কমিটি কেউ করে দিয়েন না। এতে দলের কোন উপকার হয় না। দলের ক্ষতি হয় বেশি। আর আমিতো অনেক দিন ধরে আপনাদের সঙ্গে আছি। কমবেশি অনেক মানুষকে আমি চিনি। এমনকি নাম ধরেও চিনি। আমি অনেককে চিনি যাদের আমাদের নেতারাও চিনেন না। আমি বস্তির ছেলেপেলেদের এনে দল দেখতে চাই না। সংখ্যা আমি দেখতে চাই না। আমি দলে ভাল মেরিট দেখতে চাই।
খুন গুমের বিরোধীতা করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আর আমরা কত লাশ দেখবো, খুন-গুম শুনবো। কত সান্ত¦না দেবো। হাসিনাকেও একদিন জবাবদিহি করতে হবে এবং চোখের পানি তাকেও ফেলতে হবে। কারণ তিনিও বাদ যাবেন না।’
স্বাধীনতা রক্ষার তাগিদ দিয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি, মুক্তি যুদ্ধ করেছি কারো গোলামি করার জন্য নয়। কারো শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়। এতগুলো মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের আত্মারা শান্তি পাচ্ছে না এদের গোলামির জন্য। তারা শান্তি পাবে না।’
রাষ্ট্র সংস্কার নিয়েও কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। মিলেমিশে দেশ পরিচালনার প্রত্যয় ছিল তার মনে। বলেছিলেন, দল থাকবে। কিন্তু কেউ কারো চেহারা দেখবো না। তা রাজনীতির লক্ষ্য হতে পারে না। দেশ ছোট হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশতো পিছিয়ে থাকতে পারে না। আমাদেরও সেরকম সংস্কার করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ভাল জিনিস নিতে হবে। এবং নিউ জেনারেশনকে সত্যিকারের শিক্ষিত এবং পলিটিক্সে নিয়ে আসতে হবে। সেগুলো হলো সংস্কার।
নিজের প্রতি অন্যায়ের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দেশবাসীর উদ্দেশ্যে স্বগৌরবে বলতে চাই আপনাদের খালেদা জিয়া কোন অন্যায় করেনি। কোন দুর্নীতি আমি করিনি। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আপনারা গণতন্ত্রের রক্ষক সাংবাদিক ভাইয়েরা। আজ বুলেট বাহিনী হয়েছে। এরা গণতন্ত্রকে হারিয়ে দিচ্ছে। আপনারা দেশ রক্ষা গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করুন।
আধিপত্যবাদ বিরোধী কথা বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলা কথা গুলো সামনে আসছে বার বার। খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা সকলকে বন্ধু দেখতে চাই। কিন্তু যদি কেউ বন্ধুর বেশে প্রভু হতে চায়, সেটা কখনো মেনে নেবো না। মানতে দেবো না। কারো প্রভূত্ব বাংলাদেশের জনগণ স্বীকার করবে না।’
দেশপ্রেমিক বিডিআর হত্যাকাণ্ডে তিনি আহত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিডিআরের ঘটনা হাসিনা ক্ষমতায় আসার এক মাসের মাথায় কেন ঘটলো ? হাসিনা সবকিছু জানতো। চারজন সেদিন কেন ডিনারে যায়নি ? এটা চলে এসেছে। তারপরদিন কেন ঘটনা ঘটলো ? হাসিনা এবং মঈন জানতো। তারা-ই এজন্য দায়ী এটা মানা যায় না। এর জবাব হাসিনাকে দিতেই হবে। ৫৭ জন ভাল ভাল অফিসার কিভাবে মারা হয়েছে। এটা চিন্তা করা যায় না। তাদের পরিবারের সাথে কি আচরণ করা হয়েছে। কাউকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, কাউকে গার্বেজের ভেতর দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত ছিলো আরো। আপনারা জানেন, একজন ছিল আমরা তাকে র্যাবে নিয়েছিলাম। র্যাব আর্মি রেডি ছিল। পারমিশন দেওয়া হয়নি। তারা ঢুকতে পারলে অনেককে বাঁচানো যেত। বর্তমানে যে জঙ্গি দেখানো হচ্ছে তা বিদেশীদের দেখানোর জন্য।’
দেশের কঠিন দু:সময়ে জাতিকে সাহস দিয়ে বেগম জিয়া বলেছিলেন, হাসিনা ভয় দেখাতে চায় যে গ্রেফতার করবে আমাদেরকে। হাসিনা; আমরা গ্রেফতারকে ভয় পাই না। ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিন আমাকে ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু আমি কি গিয়েছিলাম দেশের বাইরে ? যাইনি। আমি বলেছিলাম এই দেশের মাটি ও মানুষ আমার ঠিকানা। দেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নাই। এদেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। এবং কোথাও যাইনি এদেশের জনগণকে ছেড়ে।’
ওয়ান ইলিভেনের সময় মঈন উদ্দিন ফখরুদ্দিনের আমলের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল দেশের বাইরে চলে যাওয়ার। কিন্তু তিনি রাজি হননি। সাংবাদিকদের সামনে বলেছিলেন “এই দেশেই আমি থাকবো এই দেশ-ই আমার জন্মস্থান। এই দেশেই আমার মৃত্যু হবে। এই দেশের মানুষের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই। সেজন্যই আমি দেশের বাইরে যাইনি। দেশের বাইরে আমি যাবো না। কারণ দেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নাই। দেশের বাইরে আমি যাবো না। সেজন্য আমার ছেলে দুইটাকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। নানারকম নির্যাতন”। যা এখনো ভাইরাল হচ্ছে, বার বার সামাজিক মাধ্যমে সামনে আসছে।
ফ্যাসিবাদী হাসিনার শাসনামলে অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে সবার ওপর। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। বার বার ভয় দেখিয়ে দমন করার চেষ্টা করা হয়। তাতে কাজ হয়নি। একইসাথে হয়রানির খড়গ নেমে আসে অন্যান্য বিরোধী দল ও নেতাকর্মীদের ওপর। ধরে নিয়ে গুম খুন করা হয়। অকথ্য নির্যাতন করা হয়। তিনি জনগণের ওপর নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন, মানুষের ওপর অত্যাচার করে দমন করা যাবে না আন্দোলন। আপনি না থাকলেও আপনার সেই বক্তব্য মানুষের সামনে ঘুরে ফিরে আসছে।
ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর একটি অংশ জড়িয়ে পড়ে আন্দোলন দমনে। শেখ হাসিনার মসনদ টিকিয়ে রাখতে জনগণের ওপর তীব্র অত্যাচারে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে বিরোধী মতের রাজনীতিকদের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালাতে শুরু করে হাসিনার নির্দেশে। বেপরোয়া অত্যাচার শুরু করে। আন্দোলন দমনে বেআইনিভাবে জীবনের ওপর আঘাত করে। সেই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন তিনি। এসব কথা বার বার বাজছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সেদিন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীতে থাকা ফ্যাসিবাদী হাসিনার দোসরদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “ গণতন্ত্রও চাইবেন না, দেশ রক্ষা করতে চাইবেন না গোলামি করবেন ? এই গোলামি তো রাখবে না। লেন্দুপ দর্জির ইতিহাসটা পড়ে দেখেন। সেও কিন্তু টিকে নাই বেশি দিন! তাকেও বিদায় দিয়েছে এতো দালালি করে। দেশ বিক্রি করে। কাজেই এই দেশ বিক্রি চলবে না হাসিনার। দেশ রক্ষা হবেই ইনশা আল্লাহ। দালালি বন্ধ করতে বলেন। হাসিনার দালালি করে লাভ হবে না। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থাকেন, জনগণের সঙ্গে থাকেন। দেশের মানুষের সঙ্গে থাকেন। তবেই কাজে দিবে”। “দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। আজকে সকলের দায়িত্ব হয়ে গেছে দেশ বাঁচানো, মানুষ বাঁচানো। আর আপনারা ঘরে ঢুকে ঢুকে মানুষ হত্যা করছেন। মনে করেন যে এগুলোর হিসাব নেই? এই মাবোনের কান্না, আলেম এতিমের কান্না এই বিডিআর অফিসারদের ওয়াইফদের কান্না এগুলো কি বৃথা যাবে ? এগুলো কোনদিনও বৃথা যাবে না। আজকে যারা জুলুম নির্যাতন করছেন, তাদেরও একদিন চোখের পানি ফেলতে ফেলতে, পানি মুছতে মুছতে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে।”
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ভাষণগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে তাতে দেখা যায় তাঁর মধ্যে আধিপত্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেম, সংস্কার এবং মিলেমিশে দেশ পরিচালনা এবং বৈষম্য বিরোধী দেশ গঠনের কথা বার বার ওঠে এসেছে। যে বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা ছিল।