ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোলচত্বর এলাকার গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানান, ঘটনাস্থল থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিহত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টাফ অফিসার ও মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার জানান, আমরা দুপুর ১টা ১১ মিনিটের দিকে রাজধানীর কদমতলীতে গ্যাস লাইটার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পাই। খবর পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দুপুর ১টা ১৬ মিনিটের দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেন। বেলা আড়াইটার দিকে কারখানাটির আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তবে ভেতরে ধোঁয়া ছিল। তাই ৩টার পর ফায়ার ফাইটাররা কারখানার ভেতরে কেউ আছে কী না তা অনুসন্ধানে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর সেখান থেকে একে একে ৫ জনের লাশ উদ্ধার করে। তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু লাশগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে, প্রাথমিকভাবে দেখে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া এ ঘটনায় এক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখনো অগ্নিকাণ্ডের শিকার কারখানাটির ভেতরে আমাদের উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে। উদ্ধার কাজ শেষে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে দুপুর ১টা ১০ মিনিটে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিটের চেষ্টায় দুপুর আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
এদিকে এস এস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকদের বের হতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জোর করে বেরিয়ে আসা শ্রমিকেরা বলছেন, কারখানার মালিক আকরামের ছেলে এবং দারোয়ান আগুন লাগার পরও শ্রমিকদের ভেতরে আটকে রাখেন। এ সময় অনেকেই জোর করে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচান। তবে কয়েকজন ভেতরে আটকা পড়েন। কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা মিম (১১) জানায়, আগুন লাগার পর মালিক ও দারোয়ান তাদের বের হতে মানা করেন। এরপরও সে জোর করে দারোয়ানকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তবে ঘটনার পর আতঙ্কিত মিম কান্না করে তার বাবা জাহিদ ও মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তার মা-বাবা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, তা সে জানে না। তার দাদি হাজেরাও এই কারখানায় ছিলেন। তাকেও সে খুঁজে পাচ্ছে না। মিম জানায়, কারখানায় প্রায় ৭০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। আগুন লাগার পর অধিকাংশ শ্রমিক বের হয়ে গেলেও সাত থেকে আটজন বের হতে পারেননি।
এদিক আগুন লাগার পর কারখানার ভেতরে থাকা শ্রমিকদের বের হতে নিষেধ করা হয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী মিমসহ অনেকে। এ সময় অনেক শ্রমিক তাদের কথা অমান্য করে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে যারা মালিকপক্ষের কথায় বিশ্বাস করেন বা তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন, তারা বের হতে পারেননি। অভিযোগের বিষয়ে মালিক আকরামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতার শোক
ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় একটি গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান গতকাল শনিবার এক শোক বিবৃতি দিয়েছেন।
শোক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গতকাল দুপুর ১টার দিকে কদমতলীতে এক গ্যাস লাইটার কারখানায় আগুন লেগে এই বিবৃতি লেখা পর্যন্ত ৩ জন নারীসহ ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আরও ২ জন গুরুতরভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আমি এই হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি আরও বলেন, এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার-পরিজনের শোক কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। আমি নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহত ও নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
আমীরে জামায়াত বলেন, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা গড়ে ওঠার কারণে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও যথাযথ তদারকির অভাবের কারণেই এ ধরনের প্রাণহানি ঘটছে।
আমি অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আমি আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা এবং নিহত ও আহতদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।