বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উদযাপিত হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এবছর ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে সকাল ৯টায় বের করা হবে। সকাল ৮টা থেকে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলবে। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউ-টার্ন নেবে। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শোভাযাত্রা শেষ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা শুধু নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। শোভাযাত্রা চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রবেশ পথ ও সংলগ্ন সড়ক বন্ধ থাকবে। শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষার্থে আশপাশ দিয়ে শোভাযাত্রায় প্রবেশ করা যাবে না। শেষ প্রান্ত দিয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের নিজ নিজ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা অব্যাহত রেখে লোক-ঐতিহ্য ধারণ করে বড় পরিসরে এবং বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে এবছরও শোভাযাত্রায় সর্বজনীন অংশগ্রহণের আয়োজন করা হয়েছে। এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি মোটিফ থাকবে। তাহলো -মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। লোকজ প্রতীকের ধারায় এগুলো শক্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। প্রতিটি মোটিফেই প্রতিফলিত হবে বাংলার লোক-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার গভীর অনুষঙ্গ। পাশাপাশি ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, এসো হে বৈশাখ এবং দেশাত্মবোধক সংগীত শোভাযাত্রার আবহকে আরও উদ্দীপনাময়, প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবে। শোভাযাত্রায় ২শ’ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন।
পহেলা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোন ধরনের মুখোশ পরা এবং ব্যাগ বহন করা যাবে না। তবে চারুকলা অনুষদ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। নববর্ষের শোভাযাত্রায় কোন ধরনের ইংরেজি প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া বেলুন ও ফেস্টুন উড়ানো এবং আতশবাজি পোড়ানো যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভুভুজিলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
বর্ষবরণ শোভাযাত্রা চলাকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের জন্য ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখস্থ রাজু ভাস্কর্যের পেছনের গেইট, চারুকলা অনুষদ সম্মুখস্থ ছবির হাটের গেইট এবং বাংলা একাডেমির সম্মুখস্থ রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন গেইট বন্ধ থাকবে। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে সকল ধরনের অনুষ্ঠান বিকাল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত প্রবেশ করা যাবে। ৫ টার পর কোনভাবেই প্রবেশ করা যাবে না, শুধু বের হওয়া যাবে। আগামীকাল ১৩ এপ্রিল সোমবার সন্ধ্যা ৭টার পর ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না। নববর্ষের দিন ক্যাম্পাসে কোন ধরনের যানবাহন চালানো যাবে না এবং মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসরত কোন ব্যক্তি নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যাতায়াতের জন্য শুধুমাত্র নীলক্ষেত মোড় সংলগ্ন গেইট ও পলাশী মোড় সংলগ্ন গেইট ব্যবহার করতে পারবেন।
ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম এবং অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প থাকবে। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠ সংলগ্ন এলাকা, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা, দোয়েল চত্বরের আশে-পাশের এলাকা ও কার্জন হল এলাকায় মোবাইল পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হবে। নববর্ষ উপলক্ষ্যে নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে চৈত্র সংক্রান্তি বিকেলে চারুকলা অনুষদে সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকবে, যা পুরাতন বছরের সমাপ্তি ও নতুন বছরের সূচনাকে প্রতিফলিত করবে।
আজ সোমবার বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। সেখানে লোকসংগীত, নৃত্য ও শিল্পচর্চার বিভিন্ন ধারার পরিবেশনা থাকবে। এছাড়া ১৫ ও ১৬ এপ্রিল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ‘প্রত্যয় বাংলাদেশ’-এর পরিবেশনায় ‘বাগদত্তা’ ও ‘দেবী সুলতানা’ শীর্ষক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হবে।
পয়লা বৈশাখ ঘিরে জঙ্গী হামলার আশঙ্কা নেই: ডিএমপি কমিশনার
পয়লা বৈশাখ ঘিরে জঙ্গি হামলার কোনো আশঙ্কা নেই, তবুও আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার (ডিএমপি) মো. সরওয়ার। গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর রমনা পার্কে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে নিরাপত্তা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশেষ করে রমনা পার্ক ও আশপাশের এলাকায় কোনো ধরনের মুখোশ, ব্যাগ, ধারালো বস্তু ও দাহ্য পদার্থ বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এছাড়া ফানুস, আতশবাজি এবং শব্দ দূষণ সৃষ্টি করে এমন বাঁশি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিপুল মানুষের সমাগম হবে। যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারে, সেজন্য ডিএমপি ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
নববর্ষের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকা মহানগরীকে ৯টি সেক্টর ও ১৪টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল টিম দিয়ে সুইপিং করা হবে। কমিশনার আরও বলেন, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪টি পয়েন্টে ব্যারিকেড বসানো হবে। প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে ও হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি করা হবে। সিসিটিভি, ভিডিও ক্যামেরা, স্টিল ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও রুফটপে বিশেষ ফোর্স মোতায়েন থাকবে। ইভটিজিং, ছিনতাই ও পকেটমার প্রতিরোধে সাদা পোশাকে বিশেষ টিম কাজ করবে। এছাড়া হকারদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকাতেও থাকবে আলাদা নজরদারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার বা গুজব ঠেকাতে সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সকাল ৬টা ১৫ মিনিট থেকে ৮টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত চলবে। নির্ধারিত কয়েকটি গেট দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং নারী-পুরুষ ও শিল্পীদের জন্য আলাদা গেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উদ্যোগে সকাল ৯টায় শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা, যা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর হয়ে আবার চারুকলায় এসে শেষ হবে। শোভাযাত্রার পুরো রুট থাকবে কঠোর নিরাপত্তার আওতায়। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। বিকেল ৫টার পর রমনা পার্কের সব গেট শুধু বের হওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। সন্ধ্যায় কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
ট্রাফিক ডাইভারশন
পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) ভোর ৫টা থেকে শাহবাগ ও আশপাশ এলাকায় যান চলাচলে ডাইভারশন দেওয়া হবে। বাংলামোটর, কাকরাইল, হাইকোর্ট, নীলক্ষেতসহ ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যারিকেড থাকবে। যাত্রীদের বিকল্প সড়ক ব্যবহার করার অনুরোধ জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। নির্ধারিত কয়েকটি স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, মেডিকেল টিম, নৌ-পুলিশের ডুবুরি দল প্রস্তুত থাকবে। ডিএমপি কমিশনার নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করুন। কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা ডিএমপি কন্ট্রোল রুমে জানান। বৈশাখ ঘিরে জঙ্গি হামলার কোনো হুমকি রয়েছে কি না জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, কোনো হুমকি নেই। তারপরও আমাদের জোর প্রস্তুতি আছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্যে। সাংবাদিক সম্মেলন শেষে ডিএমপির সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট মহড়া কার্যক্রম চালায়।