দেশের সড়ক যেন ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। চালকরা এখনো বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছে যানবাহন। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা, ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, আয়-রোজগার ও ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

গত শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশের দুই মহাসড়কে পৃথক বাস ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৮ জন। এর মধ্যে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ যাত্রী, বগুড়া সদর উপজেলায় বাসচাপায় সাত শ্রমিক এবং একই উপজেলায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দম্পতি নিহত হন। তিন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার রেশ না কাটতেই সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও কিশোরগঞ্জে পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ছয়জন নিহত এবং অন্তত ১৯ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

বিশেষঞ্জদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতাসহ ১০ কারণে ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ রাজনীতির ধারাবাহিক চর্চার কারণে গড়ে উঠেছে। এখানে অনেকগুলো কারণ জড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। তবে প্রধান ও উৎস কারণ দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির তথাকথিত রাজনীতি। তাই সমস্যাটির সমাধান করতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। দেশের সুষম ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেজন্য জাতীয় স্বার্থেই সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিত।

তবে, সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে পার্থক্য দেখা যায়। এর অন্যতম কারণ হলো দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদ্ধতিতে সমন্বয়ের ঘাটতি। তবে সরকারি পর্যায়ে সমস্যাটির ব্যাপকতা যে গুরুতর, তা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশের ধারাবাহিকতাতেই স্পষ্ট। বিআরটিএর ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের পাশাপাশি মাসিক সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে তিন হাজার ৭৫২টি। এতে নিহত হয়েছে তিন হাজার ৩৮৭ জন। এর মধ্যে ২৩২ জন বাসযাত্রী। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে সাত হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে সাত হাজার ৩৫৯ জন, আহত হয়েছে ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। ২০২৪ সালে দেশে ছয় হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২৯৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৯ জন আহত হয়। সে হিসাবে গত বছর দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

দুর্ঘটনার প্রধান কারণ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। চালকের ভুল, যানবাহনের ত্রুটি, সড়কের দুর্বল অবকাঠামো, অতিরিক্ত গতি, আইন না মানা এবং দুর্বল তদারকি- সব মিলেই তৈরি হয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তবে বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ। নির্ধারিত গতিসীমা না মেনে গাড়ি চালানো এবং সামনের গাড়িকে অতিক্রম করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের গতিপথ বিবেচনা না করা প্রায়ই ভয়াবহ সংঘর্ষের জন্ম দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গড় যানবাহনের গতি বাড়ার সঙ্গে দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক সড়ক নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়া এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতি চালকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে দূরপাল্লার পরিবহনে চালকের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পুরোনো গাড়ি, দুর্বল ব্রেক, ত্রুটিপূর্ণ টায়ার, আলো ও স্টিয়ারিং ব্যবস্থার সমস্যা রাস্তায় বড় বিপদ তৈরি করতে পারে। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা কাগজে থাকলেই হবে না; বাস্তবে তা কতটা কঠোর ও নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতা অনেক দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখে। অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অস্পষ্ট সাইন-সিগন্যাল, অপরিকল্পিত ইউটার্ন, ফুটপাতের অভাব এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধ বাজার ও স্থাপনা পথচারী ও চালকÍউভয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। নিরাপদ সড়ক তৈরির ক্ষেত্রে শুধু রাস্তা নির্মাণ করলেই হয় না; রাস্তার নকশা, গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারীর নিরাপত্তা এবং সড়কের পাশের পরিবেশকেও বিবেচনায় নিতে হয়। এছাড়া, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা দুর্ঘটনা কমানোর পথে বড় বাধা। ট্রাফিক আইন থাকলেও যদি চালক বা যানমালিকের মধ্যে আইন ভাঙার পরিণতি সম্পর্কে ভয় না থাকে, তাহলে আইন তার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গতি, হেলমেট, সিটবেল্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নিরাপত্তা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উদ্যোগ

সড়ক দুর্ঘটনা কমানোকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে বর্তমান সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান হলো, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু চালককে দায়ী না করে সড়ক, যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ ও দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাÑ সবকিছুকে একটি সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আনা। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকারও সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে এখনো এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

পরিসংখ্যান

শুধু জুলাইয়ে দেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৩৮ জন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট নিহতের ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী এবং ৪৮ জন শিশু রয়েছেন। এছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন ১০৬ জন পথচারী এবং ৫১ জন যানবাহনের চালক ও সহকারী। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২৫ জন। একই সময়ে দেশে ১৩টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৯ জন এবং ২৯টি রেলপথের দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৬ মাসে সড়কে নিহত ৩৬০ শিক্ষার্থী

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে, ৩২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬০ শিক্ষার্থী নিহত ও ১০৯ জন আহত হয়েছে। মিরসরাই ট্রাজেডির ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১১ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীকে বহনকারী একটি মিনিট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে শিক্ষার্থীসহ ৪৫ জন নিহত হয়। দেশের ইতিহাসে এক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীর প্রাণহানির এমন দুর্ঘটনার পর সরকার শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তায় সচেতনতামূলক কোনো কর্মসূচি নেয়নি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি।

রাজধানীতে নিহত

গত ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৪৮৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩৪ জন (৭৪.৭১ শতাংশ), নারী ২১৯ জন (১৫.৮২ শতাংশ) এবং শিশু ১৩১ জন (৯.৪৬ শতাংশ)। গত শনিবার, ১ আগস্ট রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন পথচারী। মোট নিহতের ৫৯২ জন (৪২.৭৭ শতাংশ) পথচারী, ৫৩৬ জন (৩৮.৭২ শতাংশ) মোটরসাইকেল আরোহী এবং ২৫৬ জন (১৮.৪৯ শতাংশ) বাস, রিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য যানবাহনের চালক-যাত্রী।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা

দেশে গত সাড়ে ছয় বছরে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গতকাল শনিবার (৮ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বিষয়ক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা বা ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। ৫ হাজার ৪৯৭টি বা ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ভারী যানবাহনের ধাক্কায় ঘটেছে ৬ হাজার ৩১৪টি বা ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি বা ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনায়, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। পণ্যবাহী যানবাহনের কারণে ঘটেছে ৬ হাজার ৪৮১টি বা ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনা। বাসের কারণে ২ হাজার ১৬৪টি, থ্রি-হুইলারের কারণে ৭৩২টি, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ৪৩৮টি এবং পথচারীর কারণে ২৯৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বাইসাইকেল ও রিকশার কারণে ঘটেছে ১২৩টি দুর্ঘটনা।