ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। পবিত্র ঈদুল আযহার আগে ঈদযাত্রার প্রথম দিন ছিল গতকাল শনিবার। কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, ও সায়েদবাদ গাবতলি, মহাখালি বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ছাপ দেখা গেছে।
রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সময় মেনে ট্রেন ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। যদিও কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পাঁচ থেকে সাত মিনিট দেরিতে ছেড়ে যায়। ভিড় তেমন একটা ছিল না বললেই চলে। ফলে খুব একটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি ঘরমুখী যাত্রীদের। স্বস্তিতেই শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা।
সরেজমিন সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে থেকে দেখা যায়, বেশির ভাগ ট্রেন যথাসময়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীর বাড়তি চাপ সামলাতে কয়েকটি ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করা হয়েছে।
স্টেশন ব্যবস্থাপক কবীর উদ্দীন জানান.১৩ মে যেসব যাত্রী টিকিট কেটেছিলেন, তারা শনিবার ঢাকা ছাড়ছেন। শনিবার ঈদযাত্রার ৬৬টি ট্রেন ছেড়ে যাবে। ৪৩টি ট্রেন আন্তনগর, আর ২৩টি কমিউটার। রোববার থেকে স্পেশাল ট্রেন ছাড়বে।’
সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনে আসেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এবারের ঈদুল আযহার আগে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা নেই। রেলসচিব আরও বলেন, ‘আমরা তৎপর আছি। ইন্টার ডিপার্টমেন্ট সমন্বয় করছি। আশা করছি, এবার স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা আমরা দেখতে পাব।’
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আসন্ন ঈদুল আযহা’র ছুটিতে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ট্রেন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমরা ব্যাপক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাগত পদক্ষেপ নিয়েছি। বিশেষ করে ট্রেনের ছাদে ও টিকিট ছাড়া যাত্রী ভ্রমণ রোধে বাড়তি জোর দেওয়া হয়েছে।’
সচিব জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কমলাপুর, বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনসহ অন্যান্য প্রধান স্টেশনগুলোতে ইতোমধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালত ও নজরদারি দল (ভিজিল্যান্স টিম) মোতায়েন করা হয়েছে।
স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়ের বিষয়ে তিনি বলেন, টিকিটবিহীন যাত্রীরা যাতে স্টেশনে প্রবেশ করতে না পারেন, সে জন্য তিন স্তর বিশিষ্ট শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কারণ, টিকিটবিহীন যাত্রী ঢুকলে বৈধ টিকিটধারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে ছিল যাত্রীদের ভিড়। বিশেষ করে মহাখালী বাস টার্মিনালে অন্যান্য দিনের তুলনায় যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। একের পর এক আন্তঃজেলা বাস যাত্রী নিয়ে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে।
সকাল থেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের পথে রওনা হতে দেখা যায় অনেককে। কেউ যাচ্ছেন বগুড়া, কেউ ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ কিংবা জামালপুরে। তবে ঈদযাত্রার শুরুতেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে নন-ব্র্যান্ড ও লোকাল পরিবহনগুলোতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বগুড়াগামী যাত্রী সোহান বলেন, একতা বাসে আমি এর আগেও অনেকবার যাতায়াত করেছি। সাধারণ সময়ে ৫৫০ টাকায় টিকিট পেয়েছি। কিন্তু আজ একই বাসে ৫৮০ টাকা নেওয়া হয়েছে। কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, এটা নাকি বিআরটিএ নির্ধারিত নতুন ভাড়া।
ময়মনসিংহগামী মাসুদ হাসান বলেন, ইউনাইটেড বাসে এখনও নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে, এটা ভালো দিক। তবে যাত্রী অনেক বেশি হওয়ায় বাস পেতে দেরি হচ্ছে। তারপরও মানুষ বাড়ি ফিরতে চায় বলেই এত ভিড়ের মধ্যেও সবাই ধৈর্য ধরে আছে।
সরিষাবাড়িগামী যাত্রী সুমন তালুকদার বলেন, সাধারণ সময়ে যে ভাড়া ৩৫০ টাকা, এখন সেটাই ৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ঈদ এলেই কিছু পরিবহন সুযোগ নেয়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কিছু করারও থাকে না। পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরতেই হবে, তাই বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটতে হচ্ছে।
পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ট্রেন মিস করার কারণে শেষ মুহূর্তে বাসে আসতে হয়েছে। এখানে এসে দেখি টিকিট ৫২০ টাকা করে। পরিবারের পাঁচজনের জন্য অনেক টাকা গুনতে হচ্ছে। ঈদের সময় যাতায়াতে খরচ এমনিতেই বেড়ে যায়, তার ওপর বাড়তি ভাড়া সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে।
এদিকে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ সামনে রেখে যাত্রীচাপ বেড়ে যাওয়ায় টার্মিনালগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে ঘরমুখো মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি। তবে এখনো টার্মিনালজুড়ে তেমন যাত্রীচাপ দেখা যায়নি। দক্ষিণাঞ্চলগামী অধিকাংশ লঞ্চ শনিবার সকাল পর্যন্ত অনেকটাই ফাঁকা ছিল। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। শেষ অফিস দিবসের পর থেকেই ঘরমুখো মানুষের ঢল নামবে নদীপথে।
শনিবার সকালে সরেজমিনে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ রুটের বিভিন্ন টিকিট কাউন্টারে তুলনামূলক কম ভিড় রয়েছে। লঞ্চঘাট এলাকায় যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল থাকলেও ঈদকে কেন্দ্র করে সাধারণত যেরকম চাপ তৈরি হয়, তার খুব কম উপস্থিতি দেখা গেছে।
সকাল ১০টার দিকে চাঁদপুরগামী স্বর্ণদ্বীপ-৮ লঞ্চটি যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। লঞ্চটিতে পরিবার নিয়ে ওঠার সময় যাত্রী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে যাত্রা করতে পারছি। ঈদের আগে এমন ফাঁকা পরিবেশ সচরাচর দেখা যায় না। সাধারণত এই সময় ঘাটে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যায় না।’
এদিকে ফারহান-৯ নামের একটি লঞ্চ বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ইলিশা-কালীগঞ্জ ঘাটের উদ্দেশে সদরঘাট ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। লঞ্চটির যাত্রী আব্দুল কাদের বলেন, ‘এখনো যাত্রী কম। তবে দুপুরের পর হয়তো ভিড় বাড়বে। ঈদের আগে শেষ দুই-তিন দিন সাধারণত সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় নদীপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সেই চাপ সামাল দিতে প্রায় ১৭৫টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত চলাচলকারী লঞ্চের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু লঞ্চও বিশেষ সার্ভিস হিসেবে চালানো হবে।
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ২১ মে থেকে ধাপে ধাপে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২৪ মে’র পর থেকেই যাত্রীচাপ পুরোপুরি বাড়বে বলে ধারণা করছি। যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন,ফিটনেসবিহীন কোনো লঞ্চ চলাচল করতে দেওয়া হবে না। প্রতিটি লঞ্চের কাগজপত্র, লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরীক্ষা করা হচ্ছে।