রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব, যা ক্রমেই জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ঘটছে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও। উদ্বেগজনকভাবে টিকা নেওয়া শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে শয্যা সংকট তৈরি হয়েছে, মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত অভিভাবকরা শিশুদের স্কুলে পাঠাতে দ্বিধায় পড়েছেন, আর স্বাস্থ্য বিভাগ জারি করেছে সতর্কতা। সূত্র জানায়, মার্চ মাসের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৪৪জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে জরুরি ভিত্তিতে আগামী রোববার থেকে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে এ ঘোষণা দেন তিনি। তিনি বলেন, রোববার থেকে পুরো জেনারেশন কাভার হওয়া পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের হামের টিকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি এপিআই-এর অন্য টিকা কার্যক্রমও চলবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বৃহস্পতি এবং শুক্রবারের মধ্যে টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে সারা দেশে পাঠিয়ে দেবো। সারা দেশে টিকা কার্যক্রম ভালোভাবে সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে হাম মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রয়েছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যাও প্রস্তুত করা হয়েছে।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ রোববার থেকে শুরু করব। আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সব ছুটি আগামীকাল থেকে প্রত্যাহার করে নিলাম। কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে, তারা সবাই আন্ডার সুপারভিশন অব লোকাল অফিসার থাকবে এবং কাজ করবে।’

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যতটা ভয়াবহভাবে মিজেলস আমাদের আক্রমণ করেছে, আমরা তার চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্যাজুয়ালটি হয়েছে। বাট অবশ্যই বলব, এটা আমাদের অনেকটা সার্থকতা, আমরা এটা ম্যানেজ করেছি প্রপারলি। ওয়ার্ড ম্যানেজ করেছি বিভিন্ন জায়গায়। আমরা ত্বরিত গতিতে বেসরকারি খাত থেকে ভেন্টিলেটর কালেক্ট করেছি, যেটা খুবই দরকার ছিল। ভেন্টিলেটর কালেক্ট করে আমরা সব জায়গায় ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করেছি, যাতে ভেন্টিলেশন দেওয়া যায়। বাচ্চারা যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসের হামের একটা ক্যাম্পেইন হয়েছিল। তবে সবাইকে তখন এর আওতায় আনা হয়নি। অসম্পূর্ণ অবস্থায় ওই ক্যাম্পেইন শেষ করা হয়েছে

সূত্র জানায়, চলতি বছর হাম রোগে অন্তত ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মার্চ মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৩২ শিশুর। ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগটি ছড়িয়েছে। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং রাজশাহী ও পাবনায় ১ জন করে শিশু মারা গেছে। তবে সব জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য মিলিয়ে চলতি বছর ৪৬ এরও বেশি মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মহাখালী ১০০ শয্যার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলতি বছর ৫৬০ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে গত বছর পুরো বছরেই সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯ জন। চলতি মাসের ২৯ দিনে সেখানে ৪৪৮ জন ভর্তি হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতিও গুরুতর। সেখানে আলাদা আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫০ এবং নোয়াখালীতে গত ১৫ দিনে ৩০০-এর বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা টিকা গ্রহণ না করাকে প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেছেন, প্রথম ডোজ টিকা নেওয়া ভালো হলেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যায়। কিছু ছোট কমিউনিটি বা পরিবার যেখানে টিকা নেওয়া হয়নি, তারা রোগের উৎস হয়ে থাকে।

ইপিআই পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ হাম টিকা ক্যাম্পেইন হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে এই ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালে দেশের পরিস্থিতির কারণে এটি সম্ভব হয়নি। এছাড়া গত বছর স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম তিনবার ব্যাহত হয়েছে। ভিটামিন-এ ও কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানোও বন্ধ থাকায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় মজুদ প্রায় শেষ। মাঠ পর্যায়ে মাত্র এক মাসের টিকা আছে। তবে বিশেষ ক্যাম্পেইনের জন্য নতুন টিকা ইতোমধ্যেই দেশে পৌঁছেছে। হাম রোগ দ্রুত ছড়ায় এবং শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। হামের নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তাই মূলত জটিলতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা করা হয়। শিশুর চোখের ক্ষতি রোধে ভিটামিন-এ এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। মঙ্গলবারও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চাঁদপুর ও শরীয়তপুর বিভিন্ন হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় হামের উপসর্গ নিয়ে কমপক্ষে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা থেকে হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আর হামের প্রকোপ বাড়ায় আতঙ্কিত শিশুদের অভিভাবকরা। সংক্রমণ বাড়ায় ভয়ে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন তারা। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কায় সতর্কাবস্থায় রয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

চিকিৎসকরা বলছেন, দেশজুড়ে দ্রুত হারে বাড়ছে হাম। শিশুদের রোগ হলেও এখন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করা। তাই সবাইকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।