সারাদেশে ব্যাপক অভিযান চলছে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতকারীদের বিরুদ্ধে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জেলায় এ অভিযান পেট্রোলপাম্পে চলছে । অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল। জেল জরিমানা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটছে।

গত মার্চ ও এপ্রিল ২০২৬ মাসে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড কর্তৃক জ্বালানি তেল (ডিজেল) জব্দের পরিসংখ্যান ২২ মার্চ ডিজেল ৫,২০০ লিটার বহিনোঙ্গর, চট্টগ্রাম। ২৪ মার্চ ডিজেল ১,৬০০ লিটার লাউডোর ফেরিঘাট, মোংলা, বাগেরহাট। ২৬ মার্চ ডিজেল ২৫০ লিটার বহিনোঙ্গর, চট্টগ্রাম। ২৭ মার্চ ডিজেল ৮০০ লিটার ১৪ নং ঘাট পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। ২৮ মার্চ ডিজেল ১৬০০ লিটার পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। ২৯ মার্চ ডিজেল ২৩০ লিটার বহিনোঙ্গর, চট্টগ্রাম। ২৯ মার্চ ডিজেল ১২,৬১৩ লিটার মোংলা, বাগেরহাট। মোট ২২,২৯৩ লিটার ডিজেল (বাইশ হাজার দুইশত তিরানব্বই লিটার)।

০২ এপ্রিল ডিজেল ৩৭,০০০ লিটার সদরঘাট, চট্টগ্রাম। ০৩ এপ্রিল ডিজেল ৬,০০০ লিটার পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম। ০৩ এপ্রিল ডিজেল ২,০০০ লিটার ভেদুরিয়া ফেরিঘাট, ভোলা। ০৬ এপ্রিল ডিজেল ৪,০০০ লিটার চটকিমারা চর, ভোলা। মোট ৪৯,০০০ লিটার ডিজেল (উনপঞ্চাশ হাজার লিটার) সর্বমোট জ্বালানিঃ ৭১,২৯৩ লিটার ডিজেল (একাত্তর হাজার দুইশত তিরানব্বই লিটার)।

০৬ এপ্রিল ৬৪ জেলা থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযান সংখ্যা: ৩৮৪ টি মামলার সংখ্যা: ১৯৪ টি, সর্বমোট অর্থদন্ড: ৮,২৪,৯০০ টাকা, কারাদন্ড: ০৩ জন।

০৬ এপ্রিল ৬৪ জেলা থেকে অবৈধভাবে মজুদকৃত জ্বালানি উদ্ধার , ডিজেল: ১,৭৮১ লিটার অকটেন: ৯৬ লিটার পেট্রোল: ১,১৩০ লিটার ঢাকা মহানগরী: ৬৫০ লিটার ডিজেল। সর্বমোট: ৩,৬৫৭ লিটার।

জানা গেছে, জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে কোনো ধরনের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে জ্বালানি তেল ডিজেল, মবিল ও গ্যাস সিলিন্ডার মজুত করে চড়া দামে বিক্রি করে আসছিল এক অসাধু ব্যবসায়ী। এছাড়া পেট্রোলপাম্প থেকে তেল সংগ্রহের পর বোতলজাত করে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে এদিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সোয়াদ ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায় ৫০ হাজার লিটার পেট্রোল ‘গায়েব’ হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত পাম্প মালিক ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাফেজ আজিজুল হককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিকেলে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হাবিবুল ইসলাম খান শহীদ। এর আগে মঙ্গলবার গৌরীপুরের সোয়াদ ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায় ৫০ হাজার লিটার পেট্রল গায়েব হওয়ার অভিযোগ উঠে।

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এ তথ্য উঠে আসে। অভিযানের নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা মনির।

এ ঘটনায় ওইদিন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জলিল হেসেন রিফাতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত রিফাত উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের হিম্মতনগর গ্রামের মো. উসমান গণির ছেলে। অপরদিকে আজিজুল হক গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব।

কোনো ধরনের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে জ্বালানি তেল ডিজেল, মবিল ও গ্যাস সিলিন্ডার মজুত করে চড়া দামে বিক্রি করে আসছিল গৌরনদী উপজেলার এক অসাধু ব্যবসায়ী।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই ব্যবসায়ীর দোকান ও বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেন বরিশাল জেলার এনএসআই’র সদস্যরা। বুধবার দুপুরে গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সুনিল সিকদারের হাট সংলগ্ন চর সরিকল গ্রামে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এসময় চর সরিকল গ্রামের আব্দুল করিম সিকদারের ছেলে হালিম সিকদারের দোকান ও বাড়ি থেকে অবৈধভাবে মজুত করে রাখা ৩০০ লিটার ডিজেল, ২০০ লিটার মবিল ও গ্যাস সিলিন্ডার জব্দ করা হয়।

অভিযান পরিচালনা করা এনএসআই’র বরিশাল জেলা শাখার সদস্যরা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ী হালিম সিকদার অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক দামে বিক্রি করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ অভিযোগ পেয়ে তারা অভিযান পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তারা জব্দকৃত পণ্যসহ ব্যবসায়ী হালিম সিকদারকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে সোপর্দ করেন।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও গৌরনদী উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো. মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, অবৈধ মজুতের ঘটনায় ব্যবসায়ী হালিম সিকদারকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

পাশাপাশি লাইসেন্স না করা পর্যন্ত ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসা বন্ধ রাখার জন্য লিখিত মুচলেকা রাখা হয়েছে। এছাড়া জব্দকৃত জ্বালানি তেল সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির জন্য স্থানীয় এক সমাজ সেবকের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটকে কেন্দ্র করে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার একমাত্র সাগর ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল প্রতি মাত্র ১০০ টাকার পেট্রোল বিক্রির মৌখিক নির্দেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান।

এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাইকাররা, যা পরবর্তীতে হট্টগোল ও উত্তপ্ত বাকবিত-ায় রূপ নেয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ২০০ টাকার তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়।

বুধবার সকাল ১০টার দিকে ফিলিং স্টেশন প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে মঙ্গলবার ইউএনও সরেজমিনে পাম্প পরিদর্শন করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রির মৌখিক নির্দেশনা দেন।

নওগাঁর মান্দায় অবৈধভাবে তেল মজুত এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বুধবার বিকেলে উপজেলার দেলুয়াবাড়ী বাজারে এই ঝটিকা অভিযান চালানো হয়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাবিল নওরোজ বৈশাখ। এ সময় র্যাবের একটি চৌকস দল তাকে সহযোগিতা করেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, দেলুয়াবাড়ী বাজারের ‘ভাই ভাই ট্রেডার্স’ সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি তেল (পেট্রোল) বিক্রি করে আসছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে হানা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে ঘটনার সত্যতা মেলায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে অভিযান চলাকালে একটি দোকানের পেছনে ৮ লিটার পেট্রোল লুকিয়ে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সংশ্লিষ্ট দোকানদার তেলের মালিকানা ও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তা জব্দ করা হয়। অভিযুক্ত ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া একই অভিযানে লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল চালানোর দায়ে আরও ৪টি মামলায় মোট ২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

চট্টগ্রামে অভিযান:

চট্টগ্রাম ব্যুরো

জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চট্টগ্রাম জেলায় জোরদার করা হয়েছে প্রশাসনের অভিযান। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এ পর্যন্ত ২৬৯টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে মোট ৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযানে প্রায় ৭৫ হাজার ৮২৪ লিটার তেল জব্দ করা হয়েছে। অবৈধ মজুত এবং অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির বিরুদ্ধে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

এদিকে ভোজ্যতেল মজুতকারীদের বিরুদ্ধেও অভিযান জারি রেখেছে প্রশাসন। বুধবার (৮ এপ্রিল) নগরের বায়েজিদ ও খুলশী থানা এলাকায় জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এবং বিএসটিআইয়ের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাকিব শাহরিয়ার।

অভিযানে বায়েজিদ থানার গুলবাগ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ‘আমানত প্যাকেজিং অ্যান্ড মার্কেটিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিএসটিআইয়ের সিএম সনদ ছাড়াই ফর্টিফাইড সয়াবিন তেল বোতলজাত ও বাজারজাত করার প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১ হাজার ৪২ লিটার ভোজ্যতেল, ১০ হাজার পিস মোড়ক এবং বিপুল পরিমাণ খালি বোতল জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পরে খুলশী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে লাইসেন্সবিহীনভাবে প্রায় ৫০ ড্রাম (প্রতি ড্রাম ২০০ লিটার) সয়াবিন তেল মজুত এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংরক্ষণের দায়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মালিককে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী মোট ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও ভোক্তা হয়রানি ঠেকাতে এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।