গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিখাতে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব বাংলাদেশ এবং সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের ডিন প্রফেসর ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দিকা, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, সাবেক সচিব ও কৃষিবিদ ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সিআইপিজির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোজাম্মেল হক। সঞ্চালনা করেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নয়ন বাজেট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কেন্দ্রিক হলেও রাজস্ব বাজেট অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ভর। অনেক সময় দেখা যায়, হাসপাতালের ভবন নির্মিত হলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। শিক্ষাখাতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, বাজেটের আকার বাড়লেও কর আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতার কারণে সঠিকভাবে কর সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না, এমনকি বন্দরগুলোতেও রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারি বিভাগগুলোকে আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পাশাপাশি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন।
প্রধান আলোচক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রচলিত ধারণায় বাজেট সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও বাস্তবে এটি এমন একটি হাতিয়ার, যার মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত সম্পদ অনেক সময় ধনিক শ্রেণি গোষ্ঠীর কাছে স্থানান্তরিত হয়। তিনি বলেন, বাজেটকে একটি নৈতিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যা বৈষম্য বৃদ্ধি নয়, বরং দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে।তিনি কৃষিখাতের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় কৃষিজমি সীমিত হওয়ায় কৃষিতে বিশেষ বরাদ্দ অব্যাহত রাখা জরুরি। একইসঙ্গে কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ রোধের আহ্বান জানান তিনি। স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ শিশু অপুষ্টি। একটি সুস্থ জাতি গঠনে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শিক্ষাখাত নিয়ে তিনি বলেন, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া শিক্ষার প্রকৃত মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
মূল প্রবন্ধে প্রফেসর ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা ধারায় বিভক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমান দক্ষতা ও নাগরিক চেতনা গড়ে উঠছে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঝঞঊগ শিক্ষা, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ জরুরি বলে তিনি মত দেন। পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা উচ্চমূল্যের বেসরকারি ও অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত সরকারি সেবার মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলছে। তিনি স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানান এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (টঐঈ), ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডেটাবেস, টেলিমেডিসিন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কৃষিখাত নিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণের চাপ ও ন্যায্যমূল্যের অভাবে প্রান্তিক কৃষকেরা চরম সংকটে রয়েছেন। তাই জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, গবেষণা, আধুনিক সংরক্ষণাগার এবং কৃষকবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষিকে একটি লাভজনক ও টেকসই খাতে রূপান্তর করতে হবে।
জাতীয় সংসদের সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, দেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন। তিনি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের নিরাপত্তা ও বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক ও ধারাভিত্তিক বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। তিনি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের অত্যন্ত কম বেতনের উদাহরণ তুলে ধরে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আহ্বান জানান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও কর্মসংস্থান—এই চার খাতকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষিবিদ ও সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কৃষি দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষিসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে একীভূত কাঠামোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ক্রমশ পণ্যভিত্তিক হয়ে পড়ছে, ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলে বিদেশে চিকিৎসা বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, বাজেটের বিভিন্ন ভর্তুকি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় না। কৃষি ক্রমেই অলাভজনক হয়ে উঠছে এবং জলবায়ুজনিত ক্ষতির কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গবেষণার মাধ্যমে আগাম ফসল ঘরে তোলার উপযোগী জাত উদ্ভাবনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার অকার্যকারিতা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজেটে অপচয় ও প্রতিযোগিতাহীন প্রকল্প ব্যয় রোধেরও আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে বাস্তব চাহিদার সংযোগ দুর্বল। গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তিনি কৃষিজমি রক্ষা, ব্লু ইকোনমি ও বায়ো ইকোনমিতে বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।