রেশনিং পদ্ধতির আওতায় ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এতোদিন ২৫ শতাংশ কমিয়ে তেল সরবরাহ করা হলেও, বর্তমানে তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। গতকাল বুধবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় বিপিসি। জ¦ালানি তেল সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবী জানিয়েছে মালিকরা । তবে তেল সরবারাহ নিরবিচ্ছিন্ন করার জন্য ডিপো গুলোতে সেনা সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে

বিপিসি জানায় , চলমান বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল সরবরাহ/গ্রহণ সম্পর্কিত বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করে। সে পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভাগীয় শহরে জ্বালানি তেল (অকটেন ও পেট্রোল) এর গড় বিক্রয় হতে ২৫ শতাংশ হ্রাস-এর পরিবর্তে বর্তমানে ১৫ শতাংশ হ্রাস করে ফিলিং স্টেশন প্রতি বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। হ্রাস করা বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিপিসির অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর ডিপো সুপার, বিক্রয় কর্মকর্তা এবং ডিলার/এজেন্টকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

এদিকে ডিপো ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে (পেট্রোল পাম্প) পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা। সরকার একদিকে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুদ থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে রেশনিং করে তেল সরবরাহের নির্দেশ দিচ্ছে এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি, বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনাও ঘটছে। কোথাও কোথাও হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তারা।

দ্বিগুণ বেশি দামে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত :

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্বিগুণের বেশি দামে দুই দেশ থেকে তিন কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে দুই কার্গো এবং যুক্তরাজ্য থেকে এক কার্গো এলএনজি আনা হবে। তিন কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ২৮০ টাকা।

বুধবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বৈঠকের নির্ধারিত অ্যাজেন্ডার বাইরে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে তিন কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব নিয়ে আসা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ এর বিধি-১০৫(৩) (ক)-অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এই এলএনজি আনা হবে। চলতি বছরের ৫-৬ এপ্রিল এক কার্গো, ৯-১০ এপ্রিল এক কার্গো এবং ১২-১৩ এপ্রিল আর এক কার্গো এলএনজি আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিন কার্গো এলএনজি’র মধ্যে যুক্তরাজ্যের টোটাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে এক কার্গো এলএনজি ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩০৪ টাকা দিয়ে আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ’র মূল্য ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৫৮ ডলার।

তেলের প্রধান ডিপোগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত :

দেশে চলমান জ্বালানি তেলের সংকটের মুখে তেলের প্রধান ডিপোগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মার্চ মাসে চলমান সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন জ্বালানি তেলের ডিপো থেকে ডিলারদের পক্ষ থেকে আকস্মিক ও বর্ধিত চাহিদা তৈরি হয়েছে । এই বিপুল চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে বিপণন কোম্পানিগুলো (পদ্মা অয়েল পিএলসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড) হিমশিম খাচ্ছে । এর ফলে প্রধান প্রধান স্থাপনা ও ডিপোগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।

সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মহানগরের পতেঙ্গায় তেলের ডিপোর প্রধান স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে । যেসব এলাকায় সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে তার মধ্যে রয়েছে -খুলনা জেলার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ জেলার গোদনাইল ও ফতুল্লা , দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ও বরিশাল জেলার ডিপোগুলো ।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-২ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত এই পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপণন কোম্পানিগুলোর স্থাপনার নিরাপত্তা রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়া রোধে এবং যে কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা এড়াতেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

এলএনজি আমদানি করতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে আলাপ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানির বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বুধবার সন্ধ্যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে একথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

ভারতের মতো বাংলাদেশকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে যেন ছাড় দেয়া হয় সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ সময় দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ বাণিজ্য নিয়েও কথা হয়েছে।

এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাক্ষাৎ করতে গেলে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশটি থেকে বাড়তি ডিজেল আনার বিষয়েও অনুরোধ জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনা

বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি)-১ থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘœ সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়, শাখা, উপশাখা এবং অন্যান্য অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন নির্দেশনা দেয়া হলো।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়

অফিসের অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার (এসি) এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনে লাইট ও এসি বন্ধ রাখতে হবে। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা যাবে না।

জ্বালানি সাশ্রয়

ব্যাংকের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনের জ্বালানি খরচ কমানোর লক্ষ্যে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে মিতব্যয়িতা অবলম্বন করতে হবে। ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার এবং সম্ভব হলে শেয়ারিং (কার-পুলিং) ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনুষঙ্গিক যাতায়াত ব্যয়গুলো সীমিত বা পরিহার করতে হবে।

ব্যবসায়িক কার্যক্রম

ব্যাংকগুলোকে আলোকসজ্জা এবং প্রচারণামূলক বৈদ্যুতিক ডিসপ্লে বোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সূচি ও বিধিনিষেধ যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। বিদ্যুৎ জেনারেটরে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।